সিলেটের 'মরহুম তৈমুছ আলী':গেরিলা কমান্ডার থেকে সাংসদ

জুবায়ের হাসান, ফ্রান্স থেকে: প্রায় ২৩৮ টা ছোটবড় বিলের সমন্বয়ে গড়া উঠা হাওর হাকালুকি ১৯৭১ এ হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের দূর্গ। বিল, ঝোপঝাড়-ঘন ধান ক্ষেত, চা বাগানে বসে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বপ্ন বুনেছেন রনাঙ্গনের মুক্তিবাহিনীর গেরিলা কমান্ডোরা। জুড়ী-বড়লেখা-কুলাউড়ার ভূকশিমইলসহ সিলেট পূর্বাঞ্চলের মানুষ তাদের সুরক্ষায় রাত জেগে পাহারা দিয়েছেন, রাতের আধাঁরে মুক্তিফৌজদের খাবার সরবরাহ করেছেন। স্বাধিকার স্বপ্নে ১৯৬৫ সালের প্রশিক্ষণ নেয়া মোজাহিদ বাহিনীর কমান্ডার জুড়ীর তৈমুছ আলীর রনহুংকার আর ট্রেনিংপ্রাপ্ত সিলেট পূর্বাঞ্চলের মুক্তিপাগল গেরিলা কমান্ডোদের মেশিনগান-মর্টারের অপারেশনের শব্দে রাতের আধাঁর ভেদ করে ত্রই হাকালুকি হাওর কেঁপেছে বারবার... 

২৫ শে মার্চের 'অপারেশন সার্চলাইটে' হত্যাযজ্ঞ শুরুর পর ১৯৭১ এর মার্চের শেষে স্থানীয় যুবক-EPR-মোজাহিদ বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত হয় মুক্তিবাহিনী । মুক্তিযুদ্ধের ৪ নং সেক্টরের অধীনে সেক্টর কমান্ডার সি.আর দত্তের নেতৃত্বে বিভিন্ন উপগ্রুপে বিভক্ত হয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর উপর গেরিলা আক্রমণ পরিচালনা করে মুক্তিবাহিনীর কমান্ডোরা।

পাকবাহিনীর জুড়ী ক্যাম্প থেকে, কুলাউড়া ডাকবাংলোয় স্থাপিত ক্যাম্প থেকে যতবার তৈমুছ আলীর খোঁজে অভিযান চালিয়েছে পাকবাহিনী;মৃত্যুভয় আর টর্চার সেলের অমানুষিক নির্যাতনেও জুড়ী-কুলাউড়া-বড়লেখার মানুষ অবস্থান জেনেও পাকবাহিনী ও তাদের ত্রদেশীয় রাজাকার দালালদের কাছে তাদের প্রিয় মুজিব ভাইয়ের আদর্শের কর্মী থেকে নেতা হয়ে উঠা তৈমুছ আলীর অবস্থান জানাননি। 

২৫ শে মার্চ 'অপারেশন সার্চলাইট'ত্রর গনহত্যার ধারাবাহিকতায় ১০ ত্রপ্রিল পর্যন্ত সিলেট বিমানবন্দর ত্রলাকায় অবস্থান নিয়ে পরে পাকিস্তানি হানাদাররা শক্তি সঞ্চয় করে ত্রতদঞ্চলের গ্রাম-গঞ্জে বর্বর নির্যাতন চালায়। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর ৩১ পান্জাব রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন গোলাম রসুলের নেতৃত্বে স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় জুড়ীতে, পাকিস্তানি মিলিটারি অফিসার মেজর মোগলের নেতৃত্বে কুলাউড়া ডাকবাংলোয় পাকিস্তানি টর্চার ক্যাম্পে বহু মানুষকে হত্যা করা হয়। 

স্থানীয় জুড়ী ভবানীগঞ্জ বাজারের পাকিস্তানি বাহিনীর টর্চার সেলে ধরে এনে বহু মানুষকে নির্যাতন-হত্যা, বহু নারীদের যৌনদাসী বানিয়ে রাখা হয়। অনেকের লাশ জুড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের পেছনে জগোধারী পুকুরে গনকবর দেওয়া হয়। মুক্তির সংগ্রামের এগোটা সময়টাতে যোদ্ধার মত সহযোদ্বাদের সাথে লড়ে গেছেন মরহুম তৈমুছ আলী। 

১৭ ই মার্চ জুড়ীর কিংবদন্তী সে পুরুষ মরহুম তৈমুছ আলী (এম.পি) র ৪৩ তম মৃত্যুবার্ষিকী। মরহুম তৈমুছ আলী (জন্মঃ১৫ মার্চ ১৯৩৩ ইং- মৃত্যুঃ১৭ মার্চ ১৯৭৪ইং)। ব্যাক্তি জীবনে অসম্ভব সাহসী রাজনীতিবিদ ছিলেন তৈমুছ আলী। স্বাধিকার-সুশাসন আর আপোষহীন নেতৃত্বের জন্য সিলেট পুর্বাঞ্চের গনমানুষের প্রিয় নেতা ছিলেন। ১৯৭১ র মুক্তিযুদ্ধ পুর্ববর্তী ১৯৭০ এর নির্বাচনে সিলেট-১২ আসনে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন । ১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধে শেষে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী দেশ গড়ার কাজে আংশ নেন। কিন্তু বিরুদ্ধবাদীদের ষড়যন্ত্রে তাকে প্রানে হত্যার জন্য গুলি চালানো হয় জুড়ী ধামাই চা বাগানে। আহমদ নামে তার একজন সহযোগী মারা যান। গাড়ির চালক গুলিবিদ্ধ হলেও সে যাএায় তিনি প্রানে বেচে যান। ১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ সন্ধ্যা ৮ ঘটিকায় জুড়ী বাসস্ট্যান্ডস্থ নিজ বাসার সামনে আততায়ীদের গুলিতে শাহাদাত বরণ করেন। 

ঘটা করে স্তুতি-স্বজাতিদের স্মরণ-প্রার্থনা ছাড়াই হয়তো অন্যসব দিনের মতো দিনটা চলে যাবে! খরা মৌসুমে মানুষের চলাচলে তৈরী হওয়া হাওরের রাস্তার খোঁজ মেলে না ভরা বর্ষাকালে। সে রাস্তা তবু রাস্তাই থেকে যায়। দিক পাল্টালেও ইতিহাস তো অনিবার্য সত্যাশ্রয়ী। সেখানে নেতা নয়; কর্মী নায়ক তৈমুছ আলীরা নায়ক ই। আর ইতিহাসে খলনায়কেরা ঘৃন্য ভিলেন। সে সত্যকে মুছিবার সাধ্য কারও নেই। ১৯৭০ এর সাধারন নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু জুড়ী রেলস্টেশনে এসে (সিলেট-১২) আসনে তার নৌকার কান্ডারি হিসাবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন তৈমুছ আলী কে। এতদঞ্চলের মানুষ ভালোবেসে নির্বাচিত করে তাকে নেতা বানিয়েছিলেন। আজও তারাই মরহুম তৈমুছ আলী কে স্মরণ করেন শ্রদ্ধায়-ভালোবাসায়। আল্লাহ উনাকে জান্নাতবাসী করুন,আমীনI

No comments: