দিরাইয়ে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের শেষকৃত্য সম্পন্ন

জুড়ী টাইমস সংবাদ: জাতীয় পতাকা দিয়ে মোড়ানো কফিন; বিউগলের করুণ সুর আর সর্বস্তরের জনতার ভালোবাসায় সিক্ত পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে চন্দন কাঠের আগুনে দাহ করার মধ্য দিয়ে শেষ হলো বর্ষিয়ান রাজনীতিক, সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) আসনের সংসদ সদস্য, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের শেষকৃত্য অনুষ্ঠান। 

সোমবার সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার পৌরসভার তার নিজ বাসভবনে অনুষ্ঠিত হয় এ শেষকৃত্য। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বিকেল ৪টায় সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মরদেহ হেলিকপ্টার যোগে শাল্লা থেকে দিরাই হেলিপ্যাড মাঠে নেমে প্রথমে তার লাশ বাজারের জগন্নাথ জিউর আখড়ায় নেয়া হয়। সেখানে ভক্ত-অনুরক্ত বিশেষ করে মহিলাদেরকে দেখতে দেয়া হয়। এরপর বিকেল ৪টা ৩৬ মিনিটে তার নিজ বাসভবনে নেয়া হলে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। পরে সেখানে জাতীয় পতাকা মোড়ানো কফিনে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানো হয়। এরপর স্থানীয় প্রশাসন, আওয়ামীলীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনসহ সর্বস্তরের জনগণের সুবিধার্থে পুষ্পস্তবক অর্পণের জন্য বালুর মাঠের মঞ্চে নেয়া হলে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজন তার মরদেহে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।

এর আগে বালুর মাঠে এক আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের সিলেট বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, সুনামগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক, সিলেট জেলা জজকোর্টের এপিপি এডভোকেট শামসুল ইসলাম, গোলাপগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মোঃ ইকবাল হোসেন, সদ্যপ্রয়াত বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ছেলে সৌমেন সেনগুপ্ত, জামালগঞ্জ উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান শামিমা শাহরিয়ার হাসান ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ এসএম জাকির হোসেন প্রমুখ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আলহাজ্ব মতিউর রহমান, সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক নাছির উদ্দিন চৌধুরী, দিরাই উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আব্দুল কদ্দুস, প্রয়াত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলহাজ্ব আব্দুস সামাদ আজাদের ছেলে আজিজুস সামাদ ডন প্রমুখ।

এদিকে বেলা ৩টা ২০ মিনিটে সদ্যপ্রয়াত বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের লাশবাহী হেলিকপ্টার সুনামগঞ্জের তার নির্বাচনী এলাকা শাল্লায় অবতরণ করে এবং ৩টা ৫০ মিনিটে তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান দেয়া হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সুনামগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক, জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এনামুল কবীর ইমন, শাল্লা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান অবনী মোহন দাস, উপজেলা আওয়ামীলীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি অলিউল হক, আব্দুস সাত্তার, বিবেকানন্দ বকুল ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আল আমিন চৌধুরী প্রমুখ।

বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী ও আওয়ামীলীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত রোববার ভোর চারটা ২৫ মিনিটে রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। এর আগে শনিবার রাত ৯টার দিকে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেয়া হয়। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা ডা. বরেন চক্রবর্তী জানান, লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় শনিবার রাত ১০টার দিকে ১৫ মিনিটের জন্য তার হার্টবিট ছিলনা। চিকিৎসকদের চেষ্টায় পুনরায় হার্টবিট ফিরে আসলেও তার শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। ডা. বরেন চক্রবর্তী বলেন, তাকে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়ার জন্য পরিবারের সদস্যদের আগ্রহ ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকায় দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
 
বাবার অসমাপ্ত কাজ শেষ করবেন সৌমেন সেনগুপ্ত:
সদ্যপ্রয়াত বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ছেলে সৌমেন সেনগুপ্ত বলেছেন, ‘আমার বাবা মারা গেছেন। এখন আমাদের অভিভাবক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আমার বাবার রেখে যাওয়া অসমাপ্ত কাজ আমি শেষ করবো।’ রোববার রাজধানীর জিগাতলায় নিজ বাসায় সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন সৌমেন সেনগুপ্ত।
 
চন্দন কাঠে দাহ হবে সুরঞ্জিতের মরদেহ:
শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী আওয়ামীলীগের প্রবীণ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে চন্দন কাঠের চিতায় দাহ করা হয়। তার নিজ হাতের লাগানো চন্দন গাছের কাঠ থেকেই তাকে দাহ করা হয়। জানা যায়, সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার পৌর শহরের তার নিজ বাসায় তিনি চন্দন গাছ লাগিয়েছিলেন এবং তার শেষ ইচ্ছানুযায়ি তাকে সেই কাঠের গাছ দিয়েই দাহ করা হয়।
 
ছোট দলের বড় নেতা:
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ১৯৭৯ সালের সংসদে ছিলেন একতাপার্টির প্রতিনিধি হয়ে। ১৯৯১ সালের সংসদে গণতন্ত্রীপার্টি থেকে নির্বাচিত হন তিনি। ছোট দলের বড় নেতা হিসেবে রাজনৈতিক অঙ্গণে পরিচিত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আওয়ামীলীগে যোগ দেয়ার পর ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে দিরাই-শাল্লা আসনে হেরে গিয়েছিলেন। পরে বানিয়াচং-আজমিরিগঞ্জ আসন থেকে উপ-নির্বাচনে বিজয়ী হন তিনি। এরপর অষ্টম, নবম ও দশম সংসদেও তিনি দিরাই-শাল্লা থেকে নির্বাচিত হন।

দেশের প্রথম সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ছিলেন নবম সংসদে পঞ্চদশ সংবিধান সংশোধন কমিটির কো-চেয়ারম্যান। ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। ২০০৮ সালে আওয়ামীলীগ দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসার পর তিনি রেলমন্ত্রী হন। কিন্তু পাঁচ মাসের মাথায় এপিএসের গাড়িতে বিপুল অর্থ পাওয়া গেলে তিনি চাপে পড়ে যান। এ সময় তিনি পদত্যাগ করলেও তা গ্রহণ না করে সে সময় তাকে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী হিসাবে রাখেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দশম সংসদে নির্বাচিত হওয়ার পর সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে আর মন্ত্রিত্বে ফেরানো হয়নি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত।

বাঘে ধরলে ছাড়ে, শেখ হাসিনা ধরলে ছাড়েনা:
২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামীলীগ ও বিএনপিতে সংস্কারের প্রস্তাব তোলাদের দলে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তও ছিলেন বলে অনেকে মনে করেন। নির্বাচনের পর শেখ হাসিনার ‘সংস্কারপন্থি’ হিসেবে পরিচিত অন্যদের মত সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকেও মন্ত্রিসভার বাইরে রাখা হয়। পরে দলের কেন্দ্রীয় কমিটি থেকেও বাদ পড়েন সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মতো ‘সংস্কারপন্থি’ নেতারা, তাদের কয়েকজনের স্থান হয় ‘ক্ষমতাহীন’ উপদেষ্টা পরিষদে। জরুরি অবস্থার সময় ভূমিকা নিয়ে দলে ‘কোনঠাসা’ হওয়ার প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যমে সাবলীল এই বর্ষিয়ান রাজনীতিককে এটাও বলতে দেখা যায়, ‘বাঘে ধরলে ছাড়ে, শেখ হাসিনা ধরলে ছাড়েনা’।

আমি শেষ ট্রেনের যাত্রী:
সরকারের তিন বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর সুরঞ্জিত সেনগুপ্তরই মন্ত্রিসভায় স্থান হয়, পান নবগঠিত রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি বলেছিলেন, “আমি শেষ ট্রেনের যাত্রী।”
চার ভাই ও এক বোনের মধ্যে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ছিলেন সবার ছোট। তিন ভাই আগেই মারা গেছেন; একমাত্র বোন কলকাতায় বসবাস করছেন। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের স্ত্রী জয়া সেনগুপ্ত একটি বেসরকারি সংস্থার শিক্ষাবিভাগে সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করেন। একমাত্র পুত্র সৌমেন সেনগুপ্ত একজন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার (আইটি প্রকৌশলী), বর্তমানে একটি বেসরকারী কোম্পানিতে কর্মরত। পুত্রবধূ রাখী মৈত্রী সেনগুপ্ত পেশায় চিকিৎসক।

কাঁদছে দিরাই-শাল্লা, তিনদিনের শোক কর্মসূচি:
বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মৃত্যুতে তার নির্বাচনী এলাকা দিরাই-শাল্লাসহ হাওরাঞ্চলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়ে দিরাই-শাল্লার আপামর জনসাধারণ। ভোর থেকেই পৌর শহরের আনোয়ারপুরস্থ তার নিজ বাসভবনে দলীয় নেতাকর্মী ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজন ভিড় জমাতে থাকেন। সবার চোখেই জল; কারো মুখেই কোন কথা নেই, একটাই জিজ্ঞাসা কখন আসবে তাদের প্রিয় মানুষটির মরদেহ। উপজেলা পর্যায়ের নেতারা কর্মী-সমর্থকদের সান্তনা দেয়ার চেষ্টা করছেন। কার্যালয় থেকে তাৎক্ষণিকভাবেই তিনদিনের শোক কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। দিরাই বালুর মাঠে দলীয় নেতাকর্মীসহ সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের পর বাসভবনের সামনে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। রোববার থেকে দিরাই ও শাল্লা উপজেলা আওয়ামীলীগ তিন দিনের শোক ঘোষণা করেছে। শোক কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে-কালো ব্যাজ ধারণ, কালো পতাকা উত্তোলন, শোক র‌্যালী, বিভিন্ন উপাসনালয়ে প্রার্থনা করা হবে বলে জানান তারা। এদিকে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত মহিলা কলেজ, পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট ছুটি ঘোষণা করে শোক র‌্যালী করে ও সেন মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতি তার মৃত্যুতে মাকের্ট বন্ধ রেখে শোক পালন করছে।

No comments: