সাংসদ লিটন গুলিতে নিহত

জুড়ী টাইমস সংবাদ: বাসায় ঢুকে গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য (এমপি) মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনকে গুলি করে হত্যা করেছে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা। গতকাল শনিবার সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সর্বানন্দ ইউনিয়নের সাহাবাজ গ্রামের নিজ বাড়িতে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত সাড়ে ৭টার দিকে তিনি মারা যান। এমপি লিটনকে হত্যার প্রতিবাদে গতকাল সন্ধ্যা থেকে গাইবান্ধা-বামনডাঙ্গা-রংপুর সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করে তার সমর্থকরা। গোবিন্দগঞ্জেও আওয়ামী লীগ সমর্থকরা এ ঘটনার প্রতিবাদে রাতেই বিক্ষোভ করেন। লিটনের মৃত্যু সংবাদে শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা।

সুন্দরগঞ্জ থানা-পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম গতকাল সন্ধ্যায় সুন্দরগঞ্জের বামনডাঙ্গার নিজ বাড়ির বৈঠকখানার সোফায় বসেছিলেন। এ সময় দলের কয়েকজন নেতাকর্মী ওই কক্ষে ছিলেন। সন্ধ্যা ৫টা ৪০ মিনিটের দিকে একটি মোটরসাইকেলে বাড়ির পূর্ব দিকের রাস্তা দিয়ে আসা অজ্ঞাত তিন যুবক সংসদ সদস্যের বাড়িতে যায়। দুর্বৃত্তদের সবার মাথায় হেলমেট ছিল। দুজন মোটরসাইকেল থেকে নেমে এসে এমপির সঙ্গে দেখা করতে চায়। অন্যজন মোটরসাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

লিটনের কোল্ড স্টোরেজের ম্যানেজার অনিল সাহা তাদের কাছে সাক্ষাতের কারণ জানতে চান। ম্যানেজার অনিল এমপির ঘরে ঢুকতেই ওই দুর্বৃত্ত ঘরের দিকে এগিয়ে গিয়ে লুকানো পিস্তল দিয়ে পরপর এমপির বুকে গুলি করে। অপর এক দুর্বৃত্ত মোটরসাইকেল স্টার্ট দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। গুলি করে তিন দুর্বৃত্ত দ্রুত দক্ষিণের রাস্তা দিয়ে পালিয়ে যায়। সংসদ সদস্য গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়েন। ঘরের মধ্যে থাকা অন্যরা ছোটাছুটি করে বেরিয়ে যায়। এ সময় তার স্ত্রী খুরশিদ জাহান স্মৃতি পাশের বাড়িতে ছিলেন। ঘটনার পর ম্যানেজার অনিল সাহার চিৎকারে তার স্ত্রীসহ ড্রাইভার ও লোকজন এসে ঘরের মধ্যে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় লিটনকে পড়ে থাকতে দেখেন।

এমপি লিটনের স্ত্রী খোরশেদ জাহান বলেন, মাগরিবের নামাজের পরপর মোটরসাইকেলে অজ্ঞাত তিন যুবক বাড়িতে ঢুকে গুলি করে পালিয়ে যায়। এমপি লিটনের কর্মচারী জুয়েল বলেন, সন্ধ্যায় মোটরসাইকেলে পাঁচ যুবক স্যারের কাছে আসেন। এদের মধ্যে তিনজন ঘরে ঢুকে স্যারের সঙ্গে কথা বলতে না বলতেই এলোপাতাড়ি গুলি করে চলে যায়।
সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে এমপি মনজুরুল ইসলামকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করার পরপরই পুলিশের রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক, বিভাগীয় কমিশনার কাজী হাসান আহমেদসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা হাসপাতালে ছুটে যান। র‌্যাব, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা হাসপাতালের নিরাপত্তা জোরদার করে তোলেন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, তার বুকে ও হাতে ৪ থেকে ৫টি গুলি করা হয়েছিল। লিটনের ডান হাতে দুটি ও বুকের ডান পাশে একটি গুলি লেগেছে। অপারেশন থিয়েটারে তিনি মারা যান। পরে রাত সাড়ে ৭টার দিকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. বিমল চন্দ্র রায় তার মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করেন। তিনি সাংবাদিকদের জানান, এমপি লিটনকে বাঁচানোর চেষ্টায় সফল হননি তারা। লিটনের বুকের বাম দিকে দুটো এবং বাম হাতে একটি গুলি লেগেছিল বলে তিনি জানান। পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ দিবাকর জানান, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে আগামীকাল (আজ) তার মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

দুর্বৃত্তদের গুলির ঘটনার পরপরই এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। রাস্তার বিভিন্ন স্থানে পুলিশের চেক পোস্ট বসানো হয়। তল্লাশি করা হচ্ছে গাইবান্ধা শহরের বিভিন্ন প্রবেশ পথ ও সুন্দরগঞ্জের বিশেষ কিছু জায়গায়। সুন্দরগঞ্জ থানার ওসি আতিয়ার রহমান জানান, এই মুহ‚র্তে কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে তা বলা মুশকিল। তবে এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। আলামত সংগ্রহ করা হচ্ছে। কারা ও কোন ঘটনার সূত্র ধরে এ ঘটনা ঘটিয়েছে তা জানতে চেষ্টা করছে পুলিশ।

এমপি লিটনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে সুন্দরগঞ্জে তার নিজ এলাকার মানুষ এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। অনেক স্থানে তারা গাছ ফেলে রাস্তার ব্যারিকেড সৃষ্টি করেন। লিটনের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছে গাইবান্ধা জেলা আওয়ামী লীগ। একই দাবিতে সড়ক অবরোধ এবং বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে গোবিন্দগঞ্জ ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ।

গাইবান্ধার পুলিশ সুপার মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, এমপির স্ত্রী ফোন করে তার গুলিবিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি পুলিশকে জানান। খবর পেয়ে পুলিশের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে যান। ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

সংসদ সদস্য মনজুরুল ইসলাম লিটনের মৃত্যুর সংবাদে শোক প্রকাশ করেছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরিন শারমীন চৌধুরী। গতকাল এক শোকবার্তায় এমপি লিটনের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রসঙ্গত, গত বছর সুন্দরগঞ্জের শিশু শাহাদাত হোসেন সৌরভকে গুলি করে আলোচনায় আসেন এমপি লিটন। সৌরভকে হত্যাচেষ্টার মামলার আসামি করা হয় তাকে। ওই মামলায় তিনি জামিনে ছিলেন। ২০১৫ সালের ২ অক্টোবর সকালে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার গোপালচরণ গ্রামের বাড়ির পাশের সড়কে চাচার সঙ্গে হাঁটতে বের হয় শিশু শাহাদাত। তখন সে এমপি লিটনের গুলিতে আহত হয়। এ ঘটনায় সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় ব্যাপক আন্দোলন হয়। ৩ অক্টোবর রাতে শাহাদাতের বাবা সাজু মিয়া হত্যাচেষ্টা ও গুরুতর জখমের অভিযোগে এমপি মনজুরুল ইসলাম লিটনের বিরুদ্ধে সুন্দরগঞ্জ থানায় মামলা করেন। ওই দিনই সন্ধ্যায় তিনি তার আত্মীয়ের মাধ্যমে দুইটি অস্ত্র থানায় জমা দেন। এরপর ৬ অক্টোবর রাতে বসতবাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগে উপজেলার উত্তর শাহবাজ গ্রামের হাফিজার রহমান মণ্ডল বাদী হয়ে এমপি লিটনকে প্রধান আসামি করে মোট ১০ জনের বিরুদ্ধে একই থানায় আরেকটি মামলা করেন। ১৪ অক্টোবর রাতে গ্রেপ্তার হন তিনি। পরে তিনি জামিন পান।

No comments: