সাত দশকের আবেগ আর ভালোবাসার মিলনমেলা

জুড়ী টাইমস সংবাদ: সময়ের শ্রোতে হারিয়ে যায় অনেক কিছু। কিন্তু আবেগ, অনুভূতি কখনো হারায় না। হারায় না বন্ধুত্ব। যেমন হারায়নি ছাত্রলীগের তারুণ্যের অনুভূতি, হারায়নি যৌবনে রাজনীতির শিক্ষা ও রাজনৈতিক সহযোদ্ধার প্রতি ভালোবাসা। তাই তো প্রায় সাত দশকের আবেগ, অনুভূতি আর ভালোবাসার মিলনমেলায় মেতে উঠেছিলেন প্রবীন ও নবীন নেতাকর্মীরা। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৬৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে মঙ্গলবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এ পুনর্মিলনীর আয়োজন করেন সংগঠনটির বর্তমান নেতারা।

পুনর্মিলনীতে সংগঠনটির সাবেক ও বর্তমান নেতাকর্মীরা অংশ নেন। ছিলেন সাবেক অনেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ কেন্দ্রীয় নেতারা। সারাদেশ থেকে ছাত্রলীগের প্রতিটি সাংগঠনিক জেলার নেতাকর্মীরাও এতে অংশ নেন। মূল অনুষ্ঠান দুপুর ২টায় শুরু হওয়ার কথা থাকলেও অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছাত্রলীগের আজীবন সদস্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুষ্ঠানস্থলে এসে পৌঁছান বিকেল ৩টা ৩৫ মিনিটে। কিন্তু এর আগে বেলা ১১টা থেকেই বিভিন্ন জেলার নেতাকর্মীরা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে আসা শুরু করেন।

তাদের জন্য নির্ধারিত বসার জায়গার সামনের সারিতে স্থান করে নেন তারা। দুপুর ১২টা থেকে সাবেক নেতারা অনুষ্ঠানস্থলে আসা শুরু করেন। একে একে সাবেক নেতাদের আসার সংখ্যা বাড়তে থাকে। অনেক দিন পর দেখা হওয়ায় একে অপরকে জড়িয়ে ধরে, কুশলাদি জিজ্ঞাসা করেন। সাময়িকভাবে মেতে ওঠেন নানা গল্প-গুজবে। কেউ কেউ আবার অতীতের স্মৃতিচারণও করেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের অনেকেই শুধুমাত্র আবেগ ও ভালোবাসার কারণে পুনর্মিলনীতে এসেছেন।

ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি খন্দকার তারেক রায়হান জানান, কৈশোর ও যৌবনের অপর নাম ছাত্রলীগ। বুঝতে পারার পর থেকেই এ সংগঠনের প্রেমে পড়ি। তারপর পড়াশোনার পাশাপাশি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি। আমি গর্বিত! আমি পরিচয় দিতে গর্ববোধ করি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে সংগঠন নিজ হাতে প্রতিষ্ঠা করেছেন, সেই সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পেরেছি। এর চেয়ে বড় আনন্দ আমার কাছে আর কিছুই হতে পারে না। তিনি বলেন, সাবেক হলেও ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী থেকে শুরু করে যে কোনো কর্মসূচির কথা শুনলে সেখানে ছুটে যেতে মন চায়। তাই তো পুনর্মিলনীতে আসতে পেরে আমি অনেক খুশি। এখানে অনেকের সঙ্গে দেখা হলো, কথা হলো। অনেক ভাল লাগছে।

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ৬৯ বছরে পদার্পণ ঐতিহাসিক এ ছাত্রসংগঠনটি। ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬’র ৬ দফা, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান, ৭১’র মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৯০’র স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও পরবর্তী সময়ে সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে প্রথম সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন এ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রলীগের প্রায় ১৭ হাজার নেতাকর্মী শহীদ হয়েছেন। এ ছাড়া দেশের প্রায় সবকটি আন্দোলন-সংগ্রামে প্রাণ দিতে হয়েছে অনেক নেতাকর্মীকে।

ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা আখতারুজ্জামান বাবু জানান, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ। দলের দুঃসময়ে এ সংগঠনের একজন গর্বিত কর্মী ছিলাম। এ সংগঠনের সাবেক অনেক নেতাকর্মী নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। এ সংগঠনের একজন সাবেক নেতা হিসেবে আমি আজকের পুনর্মিলনীতে সবার প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। সেই সঙ্গে বর্তমান ও সাবেক সব নেতাকর্মীকে জানাচ্ছি শুভেচ্ছা।

ছাত্রাবস্থায় ছাত্রলীগের রাজনীতি করেছেন এমন অনেক নেতাকর্মী এখন প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের কেউ কেউ প্রিয় সংগঠনের পুনর্মিলনীতে উপস্থিত ছিলেন। একে অপরের সঙ্গে গল্প-গুজব ও আড্ডা দিতে দেখা গেছে তাদের।

সাবেক ও বর্তমান নেতাদের পদচারণায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পরিণত হয় ‘তারুণ্যের’ মিলন মেলায়। বর্তমান কমিটির নেতারা সাবেকদের অভ্যর্থনা জানান ফুল দিয়ে। এ বিষয়ে ছাত্রলীগের সভাপতি মো. সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারন সম্পাদক জাকির হোসাইন জানান, ছাত্রলীগের ৬৯তম বছরে এ সংগঠনের দায়িত্ব পালনকালে সংগঠনের সাবেক নেতাকর্মীদের নিয়ে পুনর্মিলনীর আয়োজন করতে পেরেছি। নিঃসন্দেহে এটা আমাদের একটি বড় সাফল্য। দীর্ঘ ৫ বছর পর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সাবেক ও বর্তমান নেতাদের অংশগ্রহণে পুনর্মিলনীর আয়োজন করতে পেরে আমরা আনন্দিত। সারাদেশ থেকেই সাবেক ও বর্তমান নেতারা পুনর্মিলনীতে এসেছেন। আমরা চেষ্টা করেছি, তাদের যথাসাধ্য সম্মান ও মর্যাদা দেয়ার জন্য। আয়োজনে যদি কোনো ত্রুটি থাকে, তাহলে আমরা তার জন্য সব নেতাকর্মীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করছি।

বিকেল ৩টা ৩৫ মিনিটে প্রধান অতিথি অনুষ্ঠানস্থলে এসে পৌঁছালে কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক তাকে অভিনন্দন জানান। এরপর জাতীয় ও ছাত্রলীগের দলীয় সঙ্গীত পরিবেশিত হয়। পরে বেলুন ও শান্তির প্রতীক পায়রা উড়িয়ে পুনর্মিলনীর উদ্বোধন ঘোষণা করা হয়। মূলমঞ্চে ছাত্রলীগের বিগত কমিটির বেশ কয়েকজন সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক আসন গ্রহণ করেন। তাদের প্রত্যেককে উত্তরীয় ও ব্যাজ পরিয়ে দেয়ার পাশাপাশি একটি করে ক্রেস্ট উপহার দেয়া হয়।

No comments: