আজ শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস

সাইফুল ইসলাম সুমন: আজ ১৪ ডিসেম্বর, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। বাঙালি জাতির শোকের দিন। স্বজন হারানোর বেদনাবিধুর দিন। বাঙালির জাতীয় জীবনে একাধারে শোক ও শক্তির প্রতীক এই দিনটি। বিজয়ের ঊষালগ্নে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের হারানোর দুঃসহ যন্ত্রণার দিন। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিসংগ্রামের শেষলগ্নে বাঙালি যখন চূড়ান্ত বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে, ঠিক তখনই একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী এদেশীয় নরঘাতক রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তি কমিটির সদস্যরা মেতে ওঠে দেশের বুদ্ধিজীবীদের বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞে। বিজয়ের চূড়ান্ত মুহূর্তে বাঙালি শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিকসহ দেশের মেধাবী সন্তানদের পরিকল্পিতভাবে সেই নৃশংস নিধনযজ্ঞ গোটা বিশ্বকেই হতবিহŸল করে তোলে।

সেই নৃশংস হত্যাযজ্ঞ স্মরণে প্রতি বছর ১৪ ডিসেম্বর পালন করা হয় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। শোকাবহ এ দিনে পরম শ্রদ্ধায় ও ভালোবাসায় গোটা জাতি স্মরণ করে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের। শপথ নেয় শোককে শক্তিতে পরিণত করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সুখী-সমৃদ্ধ ও মর্যাদাশীল দেশ গড়ার মাধ্যমে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের। তবে এবারের প্রেক্ষাপট একটু ভিন্ন। দীর্ঘ ৪৪ বছর পর যুদ্ধাপরাধী কসাই কাদের মোল্লা, বদর নেতা কামারুজ্জামান, নৃশংস যুদ্ধাপরাধী সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে পাক বাহিনীর এদেশীয় প্রধান দোসর আল বদর কমান্ডার মুজাহিদের ফাঁসির রায় কার্যকরের মধ্য দিয়ে জাতির কলঙ্ক মোচনের পথে আরেক ধাপ এগিয়েছে। এর ফলে শান্তি পাবে শহীদদের আত্মা। ফিনিক্স পাখির আয়ু নিয়ে শহীদ বুদ্ধিজীবীরা বারবার ফিরে ফিরে আসেন বাঙালির মানসপটে। প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে প্রতিভাত হয় কবির সেই অমিয়বাণী ‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী/ভয় নাই ওরে ভয় নাই/নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান/ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই’। শোককে শক্তিতে পরিণত করে সব যুদ্ধাপরাধীর বিচার সম্পন্নের অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে যথাযোগ্য মর্যাদায় এবারের শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উদযাপন করবে জাতি।

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই এ দেশের বুদ্ধিজীবীরা ছিলেন ঘাতকদের হত্যাযজ্ঞের টার্গেট। ২৫ মার্চের কালরাতে এবং পরবর্তী সময়ে যুদ্ধ চলাকালে সুপরিকল্পিত উপায়ে
বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্নভাবে হত্যা করা হয়েছে বুদ্ধিজীবীদের। কারণ দেশ ও জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানরা ছিলেন সত্য, সুন্দর ও ন্যায়ের প্রতীক। পাকিস্তানি শাসক- শোষক চক্রের অন্যায়-অত্যাচার ও শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে তারা ছিলেন দিকনির্দেশক এবং সোচ্চারকণ্ঠ। তাদের মেধা ও মননে অসা¤প্রদায়িকতা ও মানবিক মূল্যবোধ ছিল গভীরভাবে প্রোথিত। এই বোধ তারা ছড়িয়ে দিতে সচেষ্ট ছিলেন রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিটি স্তরে। তারা স্বপ্ন দেখতেন সুস্থ-সুন্দর সমাজের। একটি সুখী-সমৃদ্ধ ও শোষণমুক্ত প্রগতিশীল সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা তারা লালন করতেন- তাদের কর্মে ও চিন্তায়। তাই এদেশের বুদ্ধিজীবীরা পরিণত হয়েছিলেন স্বাধীনতার শত্রুদের অন্যতম লক্ষ্যবস্তুতে।
দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের পর বাংলাদেশের মানুষ যখন জাতীয় স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত তখনই ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বর্বর উন্মত্ততায় ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঙালি জাতির ওপর। সেনানিবাস থেকে বেরিয়ে তারা শুরু করে নির্বিচারে গণহত্যা। এরই প্রেক্ষাপটে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপরই শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বাংলার দামাল ছেলেরা অস্ত্র হাতে নেমে পড়ে শত্রু নিধনে। মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে যেখানে পায় আক্রমণ করতে থাকে। এভাবেই কেটে যায় দীর্ঘ ৯টি মাস।
ডিসেম্বর মাসে এসে পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায় দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী। মুক্তিসেনারা ঘিরে ফেলে রাজধানী ঢাকাকে। পরাজয় নিশ্চিত জেনে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা মেতে ওঠে বুদ্ধিজীবী হত্যার নির্মম খেলায়। দখলদার পাকিস্তানিরা মনে করেছিল যারা এ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, জাতির মননশক্তি তাদের হত্যা করতে পারলে বাঙালি জাতিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়া সম্ভব। ফলে ৯ মাসের যুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয়ের মাত্র দুদিন আগে পাকিস্তানি বাহিনীর দোসররা ঢাকায় মেধাবী ও সাহসী শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, লেখক, চিকিৎসক, প্রকৌশলীসহ শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীদের রাতের আঁধারে তাদের নিজ নিজ বাসা থেকে একে একে ধরে এনে হত্যা করে। ভয়াবহ নির্যাতনের চিহ্নসহ তাদের লাশ পাওয়া যায় রায়েরবাজার ও মিরপুরের বধ্যভূমিতে।
এবারের শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালিত হচ্ছে ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে। জাতির বহুল আকাক্সিক্ষত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এগিয়ে চলছে। ছয় শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির রায় কার্যকরের মধ্য দিয়ে কলঙ্কমোচনের পথে এক ধাপ এগিয়ে গেছে জাতি। দেশের প্রতিটি মানুষ আজ শপথ নেবে রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশের। অঙ্গীকার করবে হিংস্র শকুনের থাবা থেকে দৃঢ় প্রতিরোধের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষার। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের এই লগ্নে দেশবাসীর দৃপ্তপ্রত্যয়, মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসা¤প্রদায়িক, প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক সুখী-সমৃদ্ধ, মর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়ার।
নির্যাতনের বীভৎসতা : পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাত্র দুদিন আগে রাতের অন্ধকারে ঘাতকচক্র কেবল ঢাকা শহরেই প্রায় দেড়শ বুদ্ধিজীবী ও বিভিন্ন পেশার কৃতী মানুষকে চোখ বেঁধে অপহরণ করে নিয়ে যায় অজ্ঞাত স্থানে। সান্ধ্য আইনের মধ্যে সেই রাতে তালিকা ধরে ধরে শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিসেবী ও পদস্থ সরকারি- বেসরকারি কর্মকর্তাদের ঘর থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে হত্যা করে ফেলে রাখা হয় নিস্তব্ধ ভুতুড়ে অন্ধকারে।
পরদিন সকালে ঢাকার মিরপুরের ডোবা-নালা ও রায়েরবাজার ইটখোলায় বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে থাকতে দেখা যায় হতভাগ্য এসব বুদ্ধিজীবীর নিথর দেহ। এ যেন বাঙালির সংস্কৃতি ও সভ্যতার এক নির্মম বধ্যভূমি। কারও শরীর বুলেটবিদ্ধ, কারও শরীর অমানুষিক নির্যাতনে ক্ষত-বিক্ষত। হাত পেছনে বেঁধে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নাড়িভুঁড়িও বের করে ফেলা হয়েছিল অনেকেরই। আর ঘুম থেকে জেগে ওঠা স্বাধীনতা ছুঁইছুঁই উল্লসিত মানুষ স্বজন হারানোর সেই কালরাত্রির কথা জানতে পেরে শিউরে উঠেছিল।

বাংলাদেশ জেনোসাইড এন্ড ওয়ার্ল্ড প্রেস বইয়ে বাংলার বুদ্ধিজীবীদের লাশ ডোবায় পড়ে আছে শিরোনামের প্রতিবেদনটি তৈরি করার জন্য একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর তিন ঘণ্টার জন্য ঢাকায় এসেছিলেন সাংবাদিক নিকোলাস টোমালিন। তিনি লিখেছেন, ১৬ ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবার ঢাকায় আত্মসমর্পণের আগে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী রাজধানীতে ৫০ জনেরও বেশি বুদ্ধিজীবীকে ধরে নিয়ে একসঙ্গে গুলি করে হত্যা করে। এক সুচিন্তিত পরিকল্পনায় ঝটিকা অভিযান চালিয়ে কাজটি করা হয়। কমান্ডিং অফিসার জেনারেল নিয়াজিসহ পাকিস্তানি হাইকমান্ড এ ব্যাপারে পুরোপুরি সচেতন ছিল। নদী, পুকুর, ময়লার জঞ্জালসহ বিভিন্ন স্থানে নিয়ে হাত-পা-মুখ-চোখ বেঁধে গুলি করে, বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয় বুদ্ধিজীবীদের।
নিকোলাস টোমালিন লিখেন, বুদ্ধিজীবীদের লাশগুলো পাওয়া যায় নগরীর উপকণ্ঠে রায়েরবাজারে এক ডোবায়। আমি নিজে ৩৫টি লাশ দেখেছি। লাশ দেখে মনে হয়, ৪ থেকে ৫ দিন আগে তাদের হত্যা করা হয়েছে। আরো অনেককেই হয়তো এভাবে হত্যা করা হয়েছে। অপহরণের খবর অনুযায়ী অনেকেই ধারণা করেছেন, নিহতের সংখ্যা ১৫০ পর্যন্ত হতে পারে। লাশগুলো যাতে ডোবায় পড়ে, সে জন্য তাদের গর্তের ধারে লাইন ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে গুলি করা হয়। বাঁধের ওপর এক জায়গায় বেওয়ারিশ কুকুরের টেনে তোলা এক কঙ্কালের নগ্নতা চোখকে ধাক্কা মারছিল। এভাবেই একাত্তরের এদিন পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আল-শামস বাহিনী বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে পৈশাচিকভাবে হত্যা করে। অনেকের লাশ পাওয়া যায়নি।
হত্যার নীলনকশা : একাত্তরের ৭ ডিসেম্বর থেকে গভর্নর এ এম মালিক ও সেনাপ্রধান জেনারেল নিয়াজির তরফে হেডকোয়ার্টারে লড়াই বন্ধের বার্তা পাঠানো শুরু হয়। মিত্রবাহিনী ঢাকার উপকণ্ঠে পৌঁছে গেলে তাদের অস্ত্র সংবরণ প্রস্তাব পুরোপুরি পরাজয় স্বীকারের প্রস্তাবে পর্যবসিত হয়। শর্ত হিসেবে বলা হয়েছিল, পাকিস্তানি বাহিনীকে যেন নিরাপদে দেশে ফিরে যেতে দেয়া হয়। অথচ তখন একই সঙ্গে চলে বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা। পাকিস্তানি বাহিনী গঠিত দেশীয় গুপ্তঘাতক আলবদরের সদস্যরা নীল সংকেত পেয়ে নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্বাচিত বুদ্ধিজীবীদের বাড়ি থেকে তুলে আনে এবং মোহাম্মদপুরের ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে আটক করে নির্মম অত্যাচারের পর ১৪ ডিসেম্বর ভোরের আলো ফোটার আগে হত্যা করে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে ওই ইটের ভাটায় গাদাগাদি করে ফেলে রাখে। যুদ্ধাপরাধের বিচারের বেসরকারি সংগঠন ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির গবেষণায় উঠে এসেছে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী সুপরিকল্পিতভাবে তালিকা করে বুদ্ধিজীবীদের গ্রেপ্তার করেছিল। পরে এদেরকেই নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।
দেশের বুদ্ধিজীবী হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা রাও ফরমান আলী। আর হত্যাকাণ্ডের প্রধান সহযোগী হিসেবে আলবদর, রাজাকার, আল-শামস বাহিনীর ৫০০ সদস্যকে নিয়োজিত করা হয়। বুদ্ধিজীবী নিধনের মূল পরিকল্পনাটি হয় ১০ ডিসেম্বর। ওইদিন সন্ধ্যায় পিলখানায় ঢাকা কমান্ডের সদর দপ্তরে জেনারেল নিয়াজি, ফরমান ও জামশেদ উচ্চ পর্যায়ের সভা করেছিলেন। বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের ধরে আনার জন্য আগে থেকেই গাড়ির বহর প্রস্তুত করে রাখা হয়েছিল। জেনারেল ফরমান আলীর ডেস্ক ক্যালেন্ডারের পাতায় লেখা ছিল পূর্ব পাকিস্তানের সবুজকে লাল রং করে দেয়া হবে। যেখানে হত্যার জন্য নির্বাচিত বুদ্ধিজীবীদের নামের আদ্যক্ষরগুলো পরপর লেখা ছিল।
রাও ফরমান আলি তার বাংলাদেশের জন্ম বইয়ে এই গ্রেপ্তার অভিযানের কথা স্বীকার করেন। তার ভাষ্যে, ১০ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের একটি নতুন আদেশের কথা তিনি জানতে পান। এর আগে এ ধরনের আরো একটি আদেশ সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে জারি করা হয়েছিল। ফরমান আলি তার বইয়ে গ্রেপ্তার বুদ্ধিজীবীদের কোথায় রাখা হয়েছিল সে বিষয়ে তথ্য না দিলেও এটি স্বীকার করেছেন যে এই বুদ্ধিজীবী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের প্রহরায় ছিল রাজাকার-আলবদর বাহিনী।
কেন এই হত্যাযজ্ঞ : একাত্তরে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও সংগ্রাম যখন চূড়ান্ত বিজয় শিখরে পৌঁছাবে, ঠিক তখনই বুদ্ধিজীবীদের ওপর শেষ আঘাতটা হেনেছিল দখলদার পাকিস্তানি হানাদার ও রাজাকার, আলবদর, আল-শামস বাহিনী। বাঙালি জাতিকে চিরতরে মেধাশূন্য করার হীন চক্রান্তে সুপরিকল্পিতভাবে বেছে বেছে হত্যা করা হয় শিক্ষক, লেখক, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, চিকিৎসকদের। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ যেন মেধায়-মননে শক্তিশালী না হয়, বাংলাদেশ যেন আর মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে- এটাই ছিল ঘাতকদের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য। এছাড়া আসন্ন পরাজয়ের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করাও বুদ্ধিজীবী নিধনের আরেকটি কারণ। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি মফিদুল হক বলেন, মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী এক চরম নিষ্ঠুর খেলায় তারা বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিল। বিকৃতির চরম পর্যায়ে না পড়লে তারা অবধারিত আত্মসমর্পণের ঠিক পূর্বমুহূর্তে এমন নৃশংসতার পরিচয় দিত না। ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির আহ্বায়ক ডা. এম এ হাসান বলেন, বুদ্ধিজীবী হত্যা শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা বিস্তৃত হয় সারা দেশে এবং ৯ মাসজুড়ে। সে সব বুদ্ধিজীবী হয়তো জাতীয় পর্যায়ের ছিলেন না। কিন্তু জেলা, থানা ও গ্রাম পর্যায়ে তাদের প্রভাব ছিল। জাতির মূল্যবোধ গঠনে তারা বড় ধরনের অবদানও রেখেছেন। বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে তারা স্বাধীন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে হত্যা করেতে চেয়েছিল।
চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেলেন সূর্যসন্তানরা : একাত্তরে হত্যাযজ্ঞের শিকার শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রকৃত সংখ্যা আজও নিরূপণ করা যায়নি। তবে প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বাংলাপিডিয়ায় শহীদ বুদ্ধিজীবীর যে সংখ্যা দাঁড় করানো হয়েছে, সে অনুযায়ী শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ছিলেন ৯৯১ শিক্ষাবিদ, ১৩ সাংবাদিক, ৪৯ চিকিৎসক, ৪২ আইনজীবী এবং ১৬ জন শিল্পী-সাহিত্যিক-প্রকৌশলী। পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের দোসরদের হাতে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কজন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, দার্শনিক গোবিন্দচন্দ্র দেব, শিক্ষাবিদ জ্যোর্তিময় গুহঠাকুরতা, রাজনীতিবিদ ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত, দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা, শিক্ষানুরাগী অধ্যক্ষ নূতন চন্দ্র সিংহ, অধ্যাপক মনিরুজ্জামান, শিক্ষাবিদ মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, অধ্যাপক রাশিদুল হাসান, আনোয়ার পাশা, গিয়াসউদ্দিন আহমদ, অধ্যাপক ধীরেন্দ্র দত্ত, সিরাজুল হক খান, ড. মুক্তাদির, ড. সাদেক, ড. আমিনুদ্দীন, সায়ীদুল হাসান, ডা. ফজলে রাব্বি, ডা. গোলাম মোর্তজা, ডা. আলিম চৌধুরী, সুরকার আলতাফ মাহমুদ, সাহিত্যিক শহীদুল্লাহ কায়সার, সাংবাদিক সেলিনা পারভীন, সাংবাদিক সিরাজউদ্দীন হোসেন, আবুল খায়ের, নিজামুদ্দীন আহমেদ, শহীদ সাবের, ফয়জুুল মহী, আ ন ম গোলাম মোস্তফা প্রমুখ।
কর্মসূচি : বিজয়ের আনন্দকে সামনে রেখে জাতি আজ মিরপুর ও রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে নির্মিত স্মৃতিসৌধ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মধ্য দিয়ে শ্রদ্ধা ও বেদনার সঙ্গে স্মরণ করবে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের। সর্বত্রই আজ জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে এবং শোকের প্রতীক কালো পতাকা ওড়ানো হবে। যথাযোগ্য মর্যাদায় আজ শহীদ দিবস পালনের লক্ষ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ও পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, আলোচনা সভা, শোক র‌্যালি কবিতা আবৃত্তি, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

No comments: