‘তরল সোনা’ আগর-আতর

সালেহ এলাহী কুটি, মৌলভীবাজার থেকে : সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাবে দেশের রপ্তানি খাতে বড় অবদান রাখতে পারছে না আগর-আতর শিল্প। স্থানীয়ভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ প্রশাসনের নানারকম হয়রানি এই শিল্পের বিকাশে বাধার সৃষ্টি করছে। গাছ থেকে উৎপাদিত মূল্যবান এ সুগন্ধি রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। কিন্তু রপ্তানির ক্ষেত্রে আইনি বিভিন্ন জটিলতার কারণে আগর-আতর উৎপাদনকারীরা ফ্রান্স, ভারত, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশে অবৈধপথে বছরের পর বছর ধরে আগর-আতর রপ্তানি করছেন।

বাজারজাতকরণে সরকারের সহযোগিতা না থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য নিয়ে দর-কষাকষি করা সম্ভব হচ্ছে না। উৎপাদন পদ্ধতির আধুনিক কৌশল সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব, ই-মার্কেটিং, ই-বিজনেস সম্পর্কে ধারণা না থাকার ফলে বিকল্প পথকেই সুবিধাজনক মনে করেন আগর ব্যবসায়ীরা। এতে সরকারও প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে।
বিশ^বাজারে আগর-আতরের ব্যাপক চাহিদা থাকায় মৌলভীবাজারের প্রায় সবকটি উপজেলায় ছোট বড় বাগানের পাশাপাশি বসতবাড়ির আঙ্গিনায় আগর চাষ করা হচ্ছে। এক সময় আগর গাছে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট ক্ষতের রেজিনযুক্ত কাঠ থেকে প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে আগর তেল বা সুগন্ধি তৈরি করা হত। বর্তমানে কৃত্রিমভাবে সংক্রমণ ঘটিয়ে ১২-১৫ বছর বয়সের আগর গাছ থেকে মূল্যবান আগর সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে।

সরজমিনে দেখা গেছে, সনাতন পদ্ধতিতে কয়েকদফা প্রক্রিয়াজাতকরণের পর সংগ্রহ করা হচ্ছে মূল্যবান আগরের সুগন্ধি নির্যাস বা কাঁচা আতর। সংগৃহীত এ নির্যাস অবৈধপথে চলে যায় পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে। ভারত থেকে আগরের সেই নির্যাস যায় মধ্যপ্রাচ্যে। যেখানে আগরের নির্যাসের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের স্বার্থে স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণ, উৎপাদন পদ্ধতির আধুনিক কৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ, আগর রপ্তানিতে সাইটিস ও এনওসি সনদ বিড়ম্বনার নিরসন, গ্যাস সরবরাহ ও বন বিভাগের হয়রানি বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। উদ্যোক্তারা অভিযোগ করেছেন, বন বিভাগ আগর-আতর রপ্তানিতে অনাকাক্সিক্ষতভাবে সাইটিস সনদ প্রদানে জটিলতা সৃষ্টি করায় শিল্পটি সমস্যার মুখে পড়েছে।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মোগল আমলে দেশ-বিদেশের স¤্রাটদের দূতের আগমন ঘটত মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার সুজানগরে। কয়েকশ’ বছর ধরেই সেখানকার লোকজন আগর-আতর ব্যবসায় জড়িত আছেন। তারা একে ‘তরল সোনা’ বলেন। গত কয়েক বছরে বিশ^বাজারে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এই শিল্পটির সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হচ্ছেন অনেকে। জড়িতদের হিসাব মতে, সুজানগর ইউনিয়নের বাড়িতে বাড়িতে প্রায় তিন শতাধিক আগর কারখানা রয়েছে। তবে অধিকাংশই ছোট ও মাঝারি আকারের। শুধু বড়লেখায় বছরে আগরের নির্যাস (তেল) উৎপাদিত হয় প্রায় ২ হাজার লিটার। এক লিটার কাঁচা আতরের স্থানীয় বাজার মূল্য সাড়ে ৫ লাখ টাকার বেশি। এই ২ হাজার লিটার নির্যাস বিদেশে বিক্রি করে প্রায় ১১০ কোটি টাকা আয় করা হচ্ছে। এ ছাড়া প্রচুর পরিমাণ আগর কাঠও রপ্তানি হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আগর কাঠ ধূপের মতো জ¦ালিয়ে সুগন্ধি তৈরি করে। এই শিল্পের সঙ্গে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার নারী-পুরুষ শ্রমিক জড়িত রয়েছে বলে জানা গেছে। শতভাগ দেশীয় কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি ব্যবহারের পরও বর্তমানে আগর গাছের অভাবে আগর কারখানাগুলো বছরে ৬ থেকে ৭ মাসের বেশি উৎপাদন কার্যক্রম চালাতে

পারছে না। জুড়ি উপজেলার আগর চাষিদের সঙ্গে আলাপ করলে তারা জানান, সরকারি ব্যবস্থাপনায় আগর প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব রয়েছে। সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা দেয়া হলে ব্যক্তি উদ্যোগে আগরের চাষ বাড়বে। আগরের চাষাবাদ বৃদ্ধি ও আগর-আতর বিদেশে রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারবে সরকার। শুধু তাই নয় এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার মানুষও হতে পারে স্বাবলম্বী। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান তারা। পূর্ব-দক্ষিণ ভাগের জাহাঙ্গীর আলম জানান, আগর গাছ চুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না। প্রতিনিয়ত গাছ চুরি হচ্ছে। প্রশাসন এ ব্যাপারে উদাসীন। পুরোদমে আগর সৃষ্টির আগে চুরি করে গাছ কাটায় আগর শিল্পের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। তার মতে, চুরি করা গাছ কেনা বন্ধ করা গেলে আর গাছ চুরি হবে না।

কয়েকজন ব্যবসায়ী জানালেন, আগর গাছ একটি ঔষধি গাছ। আগর চাষের জন্য বড়লেখার আবহাওয়া খুবই উপযোগী। ছোট ছোট গাছে প্রাকৃতিকভাবে আগর বাঁধতে শুরু করে। বিগত কয়েক বছর ধরে আগর গাছে পোকার আক্রমণে আগর তৈরি সহজ হচ্ছে। এ ব্যাপারে পূর্ব-দক্ষিণ ভাগ গ্রামের কয়েস মিয়া জানান, আগর গাছে এক ধরনের পোকা ঢুকে গর্তের সৃষ্টি করে। গর্তের এই ক্ষত থেকেই আগর তৈরি হয়ে থাকে। অনেকটা প্রাকৃতিক নিয়মে আগর সংগ্রহের উপযোগী হয়ে যায় বলে লোহা বা পেরেক মারতে হয় না। এ রকম গাছকে স্থানীয়রা সাদা গাছ বলে। স্থানীয় প্রশাসন, বন বিভাগ ও বিজিবি কোনোভাবেই এসব সাদা গাছে যে আগর হয় তা বুঝতে চায় না। যার কারণে বাড়ির আঙ্গিনার এসব গাছ কাটতে বাধাসহ নানারকম হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ ছাড়া কৃত্রিম পদ্ধতিতে গাছ লাগানোর পর ৬-৭ বছর বয়স হলেই পুরো গাছে লোহার পেরেক মারা হয়। পেরেকের পাশ দিয়ে এক ধরনের কস বের হয়। এই কস বের হওয়ার পর পেরেকের চারপাশে কস জমে কালো রং ধারণ করে। এভাবে ৪-৫ বছর রাখার পর গাছ কাটা হয়। পেরেক মারা গাছ কেটে ছোট ফালি করে পেরেক খোলার পর তার চারপাশের কালো অংশ কাঠ থেকে আলাদা করা হয়। এই কালো কাঠগুলো এক থেকে দেড় মাস পানিতে ভেজানোর পর তা তুলে স্টিলের পাত্রে অনবরত জ¦াল দেয়া হয়। তখনই পাতন পদ্ধতিতে ফোঁটায় ফোঁটায় আতর নির্দিষ্ট পাত্রে জমা হয়। তবে সাদা অংশ দিয়েও একটু নি¤œমানের আতর হয়। আতর তৈরির প্রক্রিয়া শেষে কাঠের টুকরোগুলো প্রতি কেজি ৫০ টাকা দরে রপ্তানি করা হয়।

বড়লেখার গ্রামের নাজিম উদ্দীন জানান, আগর বের করার পর কাটের ডাস্টগুলো ফেলে দেয়া হয়। সেটা আমাদের দেশে কোনো কাজে লাগে না। বর্তমানে এ ডাস্টগুলোকে প্রক্রিয়া করে প্রতি কেজি ৫৫/৬০ টাকা দরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। আরবরা ডাস্টগুলোকে প্রক্রিয়া করে বহুর ও মসুচ তৈরি করে সুগন্ধির জন্য মজলিসে পোড়ায়। তিনি বলেন, আগর রপ্তানির পাশাপাশি এই ডাস্টের চাহিদা ব্যাপক। তাই বছরে প্রায় ১ হাজার টন ডাস্ট রপ্তানি করে কয়েক কোটি টাকা আয় হচ্ছে। তবে গাছ কাটা থেকে শুরু করে গ্যাস সংযোগ ও রপ্তানির জন্য মান নির্ণয়ে দেশে কোনো ব্যবস্থা না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টির পাশাপশি সঠিক দাম পান না ব্যবসায়ীরা। মান নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হলে রপ্তানি বাড়বে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা।

বড়লেখার গাংকুল গ্রামের আগর ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম জানান, বিশ^বাজারে আগর-আতরের বাজার আরো বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে। তবে আমলাতান্ত্রিক নানা জটিলতার কারণে এই শিল্পটি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নিজের বাড়ির একটি পরিপূর্ণ আগর গাছ কাটতে ভূমি অফিস থেকে হোম পারমিট, বন বিভাগ থেকে ট্রানজিট পাস সংগ্রহ করতে হয়রানির শিকার হতে হয়। বন বিভাগের কর্মকর্তাদের টাকা না দিলে কাজ হয় না। এসব সমস্যা সমাধানের দাবি জানান তিনি। সুজানগরের প্রবীণ আগর ব্যবসায়ী হাজী আছার উদ্দিন বলেন, বড়লেখার সুজানগরের ঐতিহ্যবাহী আগর-আতর শিল্পের অস্তিত্ব বিলীন ও ধ্বংসের গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। কতিপয় স্বার্থান্বেষী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এ ব্যবসাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এই চক্র প্রশাসনের বিভিন্ন বাহিনীকে অপব্যাখ্যা দিয়ে সাধারণ ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের হয়রানি করাচ্ছে। সুজানগর ইউপি মেম্বার আগর ব্যবসায়ী সহিদ আহমদ জানান, আগর-আতর ব্যবসা এখন আর সাধারণ ব্যবসা নয়, এটি আজ শিল্পের মর্যাদা পেয়েছে। এ অঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষ এ ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। সরকার আগর-আতরকে ক্ষুদ্র শিল্প ঘোষণা করে নানা সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। কিন্তু সমিতি নামধারী কতিপয় ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এসব সুবিধা নিজেরা ভোগ করে হাজার হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। তারা চায় না কোনো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী উন্নতি করুক। তিনি অভিযোগ করে বলেন, প্রশাসনের বিভিন্ন বাহিনীকে ভুল বুঝিয়ে সাধারণ ব্যবসায়ীকে যেভাবে হয়রানি ও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন করছে; এতে ঐতিহ্যবাহী এ ব্যবসা চরম হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। তিনি আগর-আতর ব্যবসাকে ত্বরান্বিত ও সমৃদ্ধ করতে প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেন।

আগর ব্যবসার ক্ষেত্রে সাইটিস ও এনওসি সনদ বিড়ম্বনা ও গ্যাসের অভাবে পিছিয়ে যাচ্ছে ‘তরল সোনা’ খ্যাত সম্ভাবনাময় আগর-আতর শিল্প। সুজানগরের হাবিব আলী জানান, ২০১৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী বড়লেখা ডিগ্রি কলেজ মাঠের জনসভায় আগর-আতরকে ক্ষুদ্র শিল্প হিসেবে ঘোষণা করেন। আগর শিল্পের স্বার্থে গ্যাস সংযোগ দিতে হবে। প্রায় তিন শতাধিক কারখানার মধ্যে অর্ধেকের বেশি কারখানায় গ্যাস সংযোগ নেই। আর যেসব কারখানায় গ্যাস সংযোগ রয়েছে, সেগুলোতে গ্যাসের চাপ কম থাকায় আগুনের তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় ঠিকমতো আতর উঠছে না। এতে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন আগর ব্যবসায়ীরা।

আগর পণ্য রপ্তানির জন্য সাইটিস সনদ সময়মতো পাওয়া না গেলে অনেক সময় অর্ডার বাতিল হওয়ার আশঙ্কা থাকে বলে জানান বাংলাদেশ আগর এন্ড আতর ম্যানুফ্যাকচারার্স এন্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কবীর আহমদ চৌধুরী।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, রপ্তানির নতুন বাজার সৃষ্টি ও পণ্যের বহুমুখীকরণ সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এসব পণ্যের ক্ষেত্রে মূল সমস্যা হলো আমাদের যারা প্রতিদ্ব›দ্বী আছে তাদের উৎপাদন ক্ষমতাটা আমাদের চেয়ে বেশি। তারা যেসব টেকনিক ব্যবহার করে সেগুলো করতে হবে।

সাইটিস ও এনওসি সনদের বিষয়ে সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম বলেন, সাইটিস ও এনওসি সনদ কেন্দ্রীয়ভাবেই দেয়া হয়ে থাকে। এটা একটি আন্তর্জাতিক সনদ। এই সনদ দেখেই আমদানিকারকরা আমাদের পণ্য ক্রয় করে। তাই এটা সিলেট, মৌলভীবাজার বা বড়লেখা বন বিভাগের মাধ্যমে আপাতত দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিচালক আবদুর রউফ জানান, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ২৭ হাজার মার্কিন ডলারের আগর কাঠ রপ্তানি হয়। একই সময়ে আতর রপ্তানি হয় মাত্র ৩৪৮ ডলারের। সর্বশেষ ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১ লাখ ৬২ হাজার ডলারের আগর কাঠ রপ্তানি হয়। আগর রপ্তানি হয়েছে যৎসামান্য। যদিও প্রবাসীদের মাধ্যমে প্রতিদিন মধ্যপ্রাচ্যে আতর যাচ্ছে বলে জানালেন সুজানগরের ব্যবসায়ীরা।
,

No comments: