মাল্টিমিডিয়া ও প্রজেক্টর বিতরণের নামে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার ওপেন চাঁদাবাজি!

জালাল আহমদ :: মৌলভীবাজারে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া ও প্রজেক্টর বিতরণে সরকারি বরাদ্দসহ শিক্ষকদের কাছ থেকে প্রায় দেড় লাখ টাকা অনৈতিকভাবে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার নির্দেশে। প্রধান শিক্ষকদের ক্লাস বন্ধ রেখে জেলা শিক্ষা অফিস থেকে টাকা দিয়ে মাল্টিমিডিয়া ও প্রজেক্টর গ্রহণে বাধ্য করা হয়েছে বলে শিক্ষকরা অভিযোগ করেন। অথচ মাল্টিমিডিয়া ও প্রজেক্টর বিদ্যালয় পর্যন্ত পৌঁছে দেয়ার সম্পূর্ণ খরচ সরকার বহন করে থাকে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্র জানায়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে মৌলভীবাজার জেলার ৭ উপজেলায় মোট ২৪৪টি মাল্টিমিডিয়া ও প্রজেক্টর বরাদ্দ দেয়া হয়। এর মধ্যে মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় ৪৬টি, কমলগঞ্জ উপজেলায় ৪৬টি, কুলাউড়া উপজেলায় ৪৯টি, রাজনগর উপজেলায় ২৬টি, বড়লেখা উপজেলায় ৪৬টি, শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ৪টি ও জুড়ী উপজেলায় ২৬টি মাল্টিমিডিয়া ও প্রজেক্টর বিতরণ করা হয়। এসব মাল্টিমিডিয়া ও প্রজেক্টর সরকারি খরচে বিদ্যালয় পর্যন্ত পৌঁছানোর নিয়ম থাকলেও মৌলভীবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার সিরাজুল ইসলাম সরকারি নিয়মের তোয়াক্কা না করেই বরাদ্দকৃত বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের কাছে একটি চিঠি ইস্যু করেন। সেই চিঠিতে তিনি সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে নমুনা স্বাক্ষর সত্যায়িত করে মাল্টিমিডিয়া ও প্রজেক্টর গ্রহণ করার অনুরোধ করেন। চিঠির সাথে সাথে জেলা শিক্ষা অফিসার মাল্টিমিডিয়া ও প্রজেক্টর খরচ বাবদ প্রত্যেক প্রধান শিক্ষককে ৫ শত টাকা সঙ্গে আনার মৌখিক নির্দেশ দেন। গত ৬ ও ৭ নভেম্বর মাল্টিমিডিয়া ও প্রজেক্টরগুলো বিতরণ করা হয়।

নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানায়, মাল্টিমিডিয়া ও প্রজেক্টর বিতরণের খরচ বাবদ সরকারের কাছ থেকে ২৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। আর ২৪৪টি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে ৫শ টাকা হারে ১ লাখ ২২ হাজার টাকাসহ মোট ১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা সম্পূর্ণ অনিয়মের মাধ্যমে গ্রহণ করে জেলা শিক্ষা অফিস।
মাল্টিমিডিয়া ও প্রজেক্টর বিতরণকালে সরেজমিন উপস্থিত থেকে দেখা যায়, জেলা শিক্ষা অফিসার সিরাজুল ইসলাম নিজকক্ষে বসে বিষয়টি মনিটরিং করেন। অফিস সহকারী মোবারক শিক্ষকদের কাছ থেকে টাকা আদায় করেন। এ সময় অফিস সহকারীদের সাথে অনেক প্রধান শিক্ষকের বাকবিতণ্ডাও হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শতাধিক প্রধান শিক্ষক অভিযোগ করেন, বইয়ের মতো মাল্টিমিডিয়া ও প্রজেক্টরটি বিদ্যালয় পর্যন্ত সরকারি খরচে পৌঁছানোর নিয়ম। কিন্তু টাকা আদায় করার জন্য জেলা শিক্ষা অফিসার আমাদেরকে জেলায় যেতে বাধ্য করেন। শুধু মাল্টিমিডিয়া ও প্রজেক্টরের খরচ বাবদ ৫শ টাকা ছাড়া আমাদের আসা-যাওয়াতে কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলার শিক্ষকদের জনপ্রতি কমপক্ষে আরও অতিরিক্ত ৩ শত টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। শুধু টাকা নয়, একটি দিন শিক্ষার্থীদের পাঠদান থেকেও বঞ্চিত করা হলো।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম মৌলভীবাজারে যোগদানের আগে পূর্বের কর্মস্থলে নানা অপকর্মে লিপ্ত থাকায় মৌলভীবাজার জেলার শিক্ষক নেতৃবৃন্দ ১৪দিন ধরে জেলা শিক্ষা অফিসে অবস্থান ধর্মঘট করেন। পরবর্তীতে তৎকালীন জেলা প্রশাসক কামরুল হাসানের মধ্যস্থতায় এ জেলায় কোনো ধরণের অনিয়মে জড়িত হবেন না বলে আশ্বস্ত করলে ধর্মঘট প্রত্যাহার করেন শিক্ষক সমাজ। কিন্তু যোগদানের পর থেকেই অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। শিক্ষা অফিসকে তিনি ঘুষ-দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। সম্প্রতি তিনি কমলগঞ্জে একটি অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে ব্যঙ করেন। ওই উপজেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার স্থাপন নিয়েও তিনি নানাভাবে বিদ্রুপ করেন। তার স্বেচ্ছাচারিতা আর ঘুষ-দুর্নীতির কাছে শিক্ষকরা অসহায় হয়ে পড়েছেন। কোন্ অদৃশ্য খুঁটির জোরে শিক্ষা অফিসার এমন ধৃষ্টতাপূর্ণ মন্তব্য করেও পার পেয়ে যান-এমন প্রশ্ন এখন সর্বমহলে।

দুর্নীতিতে সিদ্ধহস্ত জেলা শিক্ষা অফিসার সিরাজুল ইসলাম জানান, ঢাকা থেকে মালামাল আনতে সরকারি কোনো বরাদ্দ ছিলো না। তাহলে ওই পরিবহনের টাকা আপনার পকেট থেকে দিয়েছেন কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি জানি না, এ টাকা কোথায় থেকে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষকদের কাছ থেকে ৫শত টাকা আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।

No comments: