এম সাইফুর রহমান ছিলেন কর্ম চঞ্চল-প্রানবন্ত

মুজিবুর রহমান মুজিব॥ ৫ ই সেপ্টেম্বর ২০১৬ সাল বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী সফল অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী-ভাষা সৈনিক এম সাইফুর রহমানের-৭ম-মৃত্যোবার্ষিকী। ২০০৯ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর নিজ বাড়ি বাহার মর্দান থেকে সড়ক পথে ঢাকা যাবার পথে ব্রাক্ষনবাড়ীয়া জেলা এলাকায় এক মারাত্মক সড়ক দূর্ঘটনায় মর্মান্তিক ভাবে মৃত্যোবরণ করেন তিনি। টিভি-ব্রেকিং নিউজে তার আকস্মিক মৃত্যোসংবাদ প্রচারিত হলে সর্বত্র শোকের ছায়া নেমে আসে। ঢাকা-টিটাগাং-সিলেট-মৌলভীবাজার-বাহার মর্দানে-তাঁর স্বজন-শুভাকাংখীদের মধ্যে কান্নার রোল উঠে। সত্তরোর্ধ কর্মবীর এম. সাইফুর রহমান ছিলেন কর্ম চঞ্চল-প্রানবন্ত। বার্ধক্য জনিত ব্যাধি এবং বয়ষ তাঁকে কাবু করতে পারেনি।-কর্ম্মই জীবন-এই জীবন ঘনিষ্ট শ্লোগানের বিশ্বাসী ও অনুসারি ছিলেন তিনি। কি সরকারে কি বিরোধী দলে কাজের মাঝেই ব্যস্ত থাকেন কথার যাদুকর কর্ম্মবীর এম. সাইফুর রহমান। দূর্ঘটনাস্থল থেকে তাঁকে নিকটবর্তী হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষনা করেন। ইন্না-লিল্লাহী ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন। পরদিন ৬ সেপ্টেম্বর মৌলভীবাজার সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে তাঁর সুবিশাল নামাজে জানাজা শেষে তাঁকে তাদের পারিবারিক গোরস্থান বাহার মর্দানে-তার প্রিয় জীবন সঙ্গিনী বেগম দুররে সামাদ রহমানের কবরের পাশে চীর শয়ানে শায়িত করা হয়। সর্বোচ্ছ বারোবার বাজেট দেয়া উপমহাদেশীয়-বাজেটি-ইতিহাসে-বাজেট যাদুকর-উন্নয়ন ও অগ্রগতির অগ্রদূত-বিনিয়োগের বরপুত্র খ্যাত অর্থনীতিবিদ এম. সাইফুর রহমান রোজ কিয়ামত পর্য্যন্ত শ্যামল মাটির কোমল বিছানায় চীর শয়ানে শায়িত থাকবেন। ইহ জগতে এ ঘুম আর কোন দিন ভাঙ্গবে না। মহান মালিক তাঁর র”হের চীর শান্তি দিন।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলাধীন ঐতিহ্যাহী বাহার মর্দানে বৃটিশ ভারতের শেষ ভাগে শিক্ষানুরাগি সম্ভ্রান্তমুসলিম পরিবারে এম. সাইফুর রহমানের জন্ম। সেকালে মুসলিম সমাজে ইংরেজী শিক্ষার প্রচলন কম থাকলেও তাঁর শিক্ষাবিদ পিতা আব্দুল বাসির একজন প্রকত শিক্ষানুরাগি ছিলেন। বাল্য কৈশরেই অসম্ভব রকমের মেধাবী ছিলেন এম. সাইফুর। শৈশবেই পিতৃ বিয়োগের পর শিক্ষানুরাগি চাচা আলহাজ্ব মোঃ সফির ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধানে তার লেখাপড়া চলতে থাকে। বায়ান্ন সালে ঐতিহ্যবাহী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবস্থায় ভাষা আন্দোলনে অংশ গ্রহনও কারা বরন করেন এম. সাইফুর রহমান। গ্রেপ্তারকৃতদেরকে-মুচলেকার মাধ্যমে মুক্তি দেয়া হলে নীতিবান ও জেদী এম. সাইফুর রহমান অন্যায় ভাবে মুচলেকা দিয়ে মুক্তি চান নি-কারা যাতিনাই ভোগ করেন। ছাত্র জীবনে ছাত্র রাজনীতি ও ছাত্রনেতা না হলেও রাজনীতি সচেতন ছিলেন মেধাবী ছাত্র এম. সাইফুর রহমান। গ্রেপ্তার ও কারা যাতনা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি মেধাবী ছাত্র হিসাবে সেকেলে রেওয়াজ মোতাবেক সি.এস.পি. হয়ে বড় আমলা হতে চান নি-ভিন্ন ধারায় চিন্তা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যেজুয়েশন শেষে বানিজ্য বিভাগে উচ্চ শিক্ষার জন্য বৃটেন গমন করতঃ ৫৩-৫৮ সালে সি.এ. পড়া শেষে ১৯৫৯ সালে ইন্সটিটিউট অব চার্টার্ড একাউন্টেন্টস-ইংল্যান্ড এবং ওয়েলস এর ফেলোশীপ অর্জন করতঃ সফল শিক্ষা জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটান। মেধাবী ছাত্র এম. সাইফুর রহমান মুদ্রানীতি ও উন্নয়ন অর্থনীতিতে বিশেষায়িত শিক্ষা গ্রহন করে ছিলেন-যা তার বাস্তব জীবনে-বর্ণাঢ্য ও বর্ণীল কর্ম্মজীবনে প্রতিফলিত হয়েছে।
সফল কর্মজীবনে কর্ম্মবীর এম. সাইফুর রহমান পাকিস্তান অক্সিজেন কোম্পানীতে যোগদান করতঃ দুই বৎসর কৃতিত্বের সাতে কাজ করার পর নিজেই-রহমান এন্ড হক-কোম্পানী নামে একটি সি-এ-ফার্ম প্রতিষ্টা করেন-যা পরবর্তী কালে দেশ বিদেশে খ্যাতি অর্জন করে। স্বাধীন বাংলাদেশের মাত্র ক’বছরের মাথায় পচাত্তোরের পনেরোই আগষ্ট কতেক বিপথগামী সেনা সদস্য স্বাধীনতার মহান স্থপতি-মহামান্য রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যা করে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের সূচনা ঘটান। সসস্ত্র বাহিনী সমূহের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তৎকালীন সেনা প্রধান মেজর জেনারেল শফিউল্লা বীর উত্তমকে টেলিফোন মারফত তাকে ঘাতকের আক্রমন থেকে রক্ষা করার আহবান জানালে সেনা প্রধান শফিউল্লা কোন সাহায্য করেননি-চৌকস সেনা কর্মকর্তা কর্নেল জামিল বঙ্গবন্ধুর আহবানে তাকে রক্ষা করতে এসে স্বেচ্ছায় প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রীসভার বানিজ্য মন্ত্রী, বঙ্গবন্ধুর আজীবনের বন্ধু খন্দকার মুশতাক আহমদ তাঁর ভাষায়-“দেশে ও জাতির ঐতিহাসিক প্রয়োজনে পনেরোই আগষ্টের সারথী হয়ে”- মহামান্য রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার নিয়ে দেশে শান্তি শৃংখলা স্থাপন করতে পারেন নি-যদিও তিন বাহিনীর প্রধানগণ পই পই করে খন্দকার মুশতাক সরকারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ছিলেন। পনেরোই আগষ্টের নির্মম হত্যাকান্ডের পর বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনৈতিক অঙ্গনে অস্থিরতা-অশান্তি ও উত্তেজনা বিরাজ করতে থাকে। বিশেষতঃ বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে-চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে বিশৃংখলা বিরাজ করতে থাকে। সাম্প্রতিক কালে তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল শফিউল্লাহ্্ বীর উত্তমের ব্যর্থতার অভিযোগ উত্থাপিত হলে একাত্তোরের বীর-বীরউত্তম জেনারেল শফিউল্লাহ নির”পায় হয়ে নিজেকে স্বাধীন বাংলার ব্যর্থ সেনাপ্রধান হিসাবে নিজ ক্রটি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। দেশ ও জাতির ক্রান্তকালে একাত্তোরের মত অকোতভয় বীর যোদ্ধা পচাত্তোর উত্তর রাজনৈতিক সংকট কালেও এগিয়ে আসেন। সেনাবাহিনীর উপপ্রধান থেকে সেনাপ্রধান হয়ে সেনাবাহিনীতে কঠোর হস্তে-চেইন অব কমান্ড-ফিরিয়ে আনেন-দেশ ও জাতির দায়িত্বভারে নিয়ে আন্তরিকতার সাথে দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হন। দেশীয় রাজনীতির সেই মহা সংকট ও ক্রান্তি কালে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হয়ে জেনারেল জিয়া দেশের জ্ঞানী-গুনী-পন্ডিত-বিদ্যান-বিজ্ঞজনকে নিয়ে একটি-ট্যেলেন্টড কেবিনেট গঠন করেন। অর্থনীতিবিদ এম সাইফুর রহমান জেনারেল জিয়ার আহবানে ১৯ দফা কর্মসূচীর প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করতঃ ১৯৭৬ সালে বানিজ্য উপদেষ্টার দায়িত্বভার নিয়ে উৎপাদ ও উন্নয়নের সক্রিয় রাজনিৈততে যোগদান করেন। বানিজ্য উপদেষ্টা থেকে অর্থ মন্ত্রী হয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন অর্থানীতিবিদ এম. সাইফুর রহমান প্রেসিডেন্ট জিয়া, জাষ্টিস সাত্তার এবং বেগম খালেদা জিয়া-বি.এন.পি-র সকল সরকারামলে সফল অর্থমন্ত্রী হিসাবে মোট বারোবার বাজেট পেশ করে উপমহাদেশীয় সংসদীয় রাজনীতি-অর্থনীতি ও বাজেটি-ইতিহাসে রেকর্ড সৃষ্টি করেন। বি.এন.পি-র সকল সরকারামলে নেতা-নেত্রীদের ক্ষমতা-পদ-পদবী পরিবর্তন হলেও তাঁর বেলায় ছিল ব্যতিক্রম। বরং তিনি ছিলেন পার্মানেন্ট ফাইন্যান্স মিনিষ্টার। দুই হাজার এক সালের নির্বাচনে দুই তৃতিয়াংশের বিশাল বিজয় নিয়ে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকার গঠিত হলে জনাব এম সাইফুর রহমান অর্থের সঙ্গে পরিকল্পনা মন্ত্রনালয়ের ও দায়িত্বভার প্রাপ্ত হন। তিনি ছিলেন একাই একশ। তাঁর কোন বিকল্প ছিল না-তাঁর তুলনা ছিলেন তিনিই। বর্তমান মহাজোট সরকারামলে বর্ষীয়ান অর্থমন্ত্রী সাবেক আমলা আবুল মাল আব্দুল মোহিত এর সঙ্গে আরেক সাবেক আমলা ড. মশিউর রহমান পূর্ণ মন্ত্রীর মর্য্যাদায় অর্থ উপদেষ্টা এবং আরেক সাবেক সচিব আব্দুল মান্নান অর্থ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন। এই তিন সাবেক আমলা মহাজোট সরকার ও দেশের অর্থনীতিকে মহাজটে ফেলে দেশের গোটা অর্থনীতিকে বিধ্বস্থ-বিপর্য্যস্থ-আগোছাল-এলোমেলো করে ফেলেছেন। অর্থনৈতিক সেক্টারে কঠিন ও বলিষ্ট নেতৃত্বের অভাবে শেয়ার বাজার সীমাহীন লুন্টনে এখন কাজিমরা হয়ে কাজির বাজার, রিজার্ভ হ্যাকিং, সরকারী ব্যাংক সমূহ লাগামহীন লুন্ঠনে ইমেজ সংকটে, মাল্টি লেভেল মার্কেটিং-এম.এল.এম. এর নামে হলমার্ক, ডেষ্টিনি, যুবক ইউনিপেইড-টু-বিসমিল্লা গ্র”প বিনা বিসমিল্লাতে (তথাকথিত মুক্তমনা অতিপ্রগতিবাদী এসব নব্য শিল্পপতি আল্লাহ রসুলের নাম নিতে-বিসমিল্লাহ বলতে বিব্রত বোধ করেন। শরম পান। এসব বেশরমের লজ্জাশরম ও আছে নাকি ?) দেশ ও জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা আত্বসাত করে, সরকারি বিধি নিশেধ উপেক্ষা করে মানিলন্ডারিং এর মাধ্যমে বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার করে দিব্বি বেশ আছেন। বেসিক ব্যাংক এর হাজার হাজার কোটি টাকা আত্বসাতের খলনায়ক-বেসিকি ডাকাত সর্দার-শেখ আব্দুল হাই বাচ্চু লুন্টিত “ব্যাংক এর চেয়ারম্যান হয়েও খুটির জোরে মামলার আসামীই নন। এসব অপদার্থ-অকর্মন্য-অসৎ ব্যাংক কর্মকর্তাদের কারনে বাংলাদেশে বর্তমানে খেলাপী ঋণের পরিমান ৬৩ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা। মাননীয় অর্থমন্ত্রী অর্থনৈতিক সেক্টারের বিশৃংখলা ও লুটপাট স্বীকার করে বর্ণিত চুরিকে পুকুর চুরি না বলে সাগর চুরি বলে দায় স্বীকার করে দায়িত্ব এড়িয়ে গেছেন-দেশ ও জাতিকে মিষ্টি-মুচকি হাসি উপহার দিচ্ছেন।
অর্থনীতিবিদ এম. সাইফুর রহমান প্রেসিডেন্ট জিয়ার অর্থমন্ত্রী হিসাবে স্বাধীনতা উত্তর যুদ্ধ বিধ্বস্থ বাংলাদেশের বিপর্য্যস্থ অর্থনীতিকে পূনগঠনে আত্বনিয়োগ করেন। প্রেসিডেন্ট জিয়ার ঘনিষ্ট ও বিশ্বস্থ সহচর হিসাবে অর্থনীতিবিদ এম সাইফুর রহমানের বাজেট প্রনয়ন ও অর্থনীতির মূল ভিত্তি ছিল বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী চিন্তা চেতনা, ধ্যান ধারনা এবং প্রেসিডেন্ট জিয়ার ঐতিহাসিক উনিশদফা কর্মসূচীর ভিত্তিতে-mecro economic stability-সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতাবস্থা অর্জন। বারোবার বাজের পেশ কারি আন্তর্জাতিক
খ্যাতি সম্পন্ন অর্থনীতিবিদ এম. সাইফুর রহমান সেই- economic stability- অর্জন করেছিলেন। বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল তার নখদর্পনে। দেশীয় অর্থনীতির নাড়ি-নক্ষত্র ছিল তার চিন্তা-চেতনায়-অস্থিমজ্জায়। তিনি শেয়ার বাজারকে আলুর বাজার-বন্দর বাজার-বলেন নাই। মন্ত্রনালয়ে তাঁর শক্ত কমান্ড ছিল। ক্লিনার-থেকে গভর্ণর-পিয়ন থেকে সচিব পর্য্যন্ত সকলের কার্য্যক্রম ছিল নখদর্পনে। ড. ফখর উদ্দীন আহমদ ড. সালেহ উদ্দিন আহমদ এর মত দেশের খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদগণ তার অধীনে তাঁর নেতৃত্বে কাজ করেছেন। তাঁর ক্যারিসমাটিক ব্যক্তিত্ব, প্রজ্ঞা ও পান্ডিত্য, মেধাও মনন সিনিওরিটি ও ম্যোচিওরিটির কারনে মন্ত্রনালয়ের কোন কাজে কোন কর্তা ব্যক্তির ফাক ও ফাঁকির সুযোগ ছিলনা। জ্যেষ্টতা ও অভিজ্ঞতার কারনে তিনি বড় কর্তাদেরকে নামধরে ডেকেছেন- তুমি-বলে সম্বেধন করেছেন-মহান শিক্ষকের মত ভূলত্রুটি শোধরিয়ে দিয়েছেন। ঐতিহ্য সচেতন এম. সাইফুর রহমানের মুখে-কমলা লেবুর গন্ধ-পাওয়া গেলেও তাঁর ইংলিশ একসেন্টে চোস্ত ইংরেজী উচ্চারন ও ড্রফট ছাড়া প্রানবস্ত ইংলিশ ভাষন ছিল শুনা, দেখা ও শেখার মত। দেশ নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকারামলেও অর্থমন্ত্রী এম. সাইফুর রহমান মুন্সিয়ানা ও পারঙ্গমতার পরিচয় দিয়েছেন। ১৯৯৪ সালের দিকে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী এম. সাইফুর রহমান বিশ্বব্যাংক এর সভাপতি এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রাতহবিল-আই এম এফ এর বোর্ড অব গভর্নস এর চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হয়ে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ইমেজ ও ভাবমুর্তি বৃদ্ধি করেন। ঐ সালে আই এম এফ এর-৫০ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে অক্টোবরে অনুষ্টিত মাদ্রিদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করে তিনি দেশ ও জাতির গৌরব বৃদ্ধি করেন। তাঁর সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি শৃংখলা ছিল, উৎপাদন ও বিনিয়োগ ছিল, মুদ্রাস্ফিতি ছিল না, মুদ্রানীতি ছিল নিয়ন্ত্রনে। এমএলএম এর লুন্টন ও লোচ্চামি ছিল না। অর্থমন্ত্রী ও অর্থনীতিবিদ হিসাবে তিনি ছিলেন মিঃ ক্লিন-সাফ্ফান-সাফ্ফা।
একজন রাজনীতিবিদ হিসাবেও তিনি ছিলেন সফল। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রতিষ্টাকালীন নেতা হিসাবে তিনি ছিলেন স্থায়ী কমিটির চীর স্থায়ী সদস্য। বৃহত্তর সিলেটে তার বলিষ্ট ও গতিশীল নেতৃত্বেই দল গড়ে উঠেছে। তিনি ছিলেন বৃহত্তর সিলেটের প্রাণপুনর”ষ-একজন সর্বজন শ্রদ্ধেয় মহান অভিভাবক। ব্যক্তির চাইতে দল বড়, দলের চাইতে দেশ বড়-এই নীতির কট্রর সমর্থক ছিলেন এম. সাইফুর রহমান। দলও দেশ প্রসঙ্গে একবার একটি সাক্ষাত করে আলোড়ন তুলেছিলেন-নিঃশংক চিত্তে বলেছিলে- ‘Some body is for Awamileague, some body is for B.N.P- No body is for Bangladesh’- -কেউ আওয়ামীলীগের জন্য কেউ বি.এনপির-জন্য-বাংলাদেশের জন্য কেউ নেই-এমন বোমাফাটা বক্তব্য দিয়ে তিনি দেশীয় রাজনীতিতে আলোড়ন তুলেছিলেন। তিনি নিজে বি.এন.পি-র প্রতিষ্টাকালীন নেতা হয়ে নিজ দলকেও দেশের উপরে স্থান দেননি। দেশকে দলের উপরে স্থান দিয়েছিলেন বলেই এমন কঠিক কঠোর মন্তব্য করার দুঃসাহস শুধুমাত্র তাঁরই ছিল-বাংলাদেশে এমনটি আর দেখা যায়নি। হয়ত দেখা যাবেও না। ব্যক্তিগত জীবনে সাইফুর রহমান ছিলেন একজন সফল-সুখী ব্যক্তি। ১৯৬০ সালে চট্টগ্রামের এক অতি অভিজাত খান্দানী পরিবারের কৃতি কন্যা বেগম দুররে সামাদ এর সঙ্গে তার শুভ বিবাহ হয়। বেগম রহমান-ছিলেন একজন গুনবতী রমনী। এই দম্পতির সুখময় দাম্পত্য জীবনের ফলও ফসল-মহান আল্লাহর দান তিন পত্র-এক কন্যা-চার সন্তান। পুত্রত্রয় উচ্চ শিক্ষিত-কর্ম্মজীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত। তার প্রথম পুত্র এম নাসের রহমান কির্তিমান পিতার পদাংক অনুসরন করে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার আদর্শের সৈনিক হিসাবে রাজনীতিতে যোগ দেন। ২০০১ সালে পিতার ছেড়ে দেয়া আসন মৌলভীবাজার তিন-এ-চারদলীয় জোট এর প্রার্থী হিসাবে বিপুল ভোটে এম.পি. নির্বাচিত হয়ে উন্নয়ন কর্মকান্ডে অভিষেক ঘটান-উন্নয়নের উদীয়মান সুর্য্য হিসাবে খ্যাতি ও স্বীকৃতি অর্জন করেন। যোগ্য পিতার যোগ্য সন্তান এম. নাসের রহমান বর্তমানেও জেলা বিএনপির সভাপতির গুর” দায়িত্ব কৃতিত্বের সাথে পালন করেছেন। পুত্রদ্বয় কাওসার রহমান ও শফিউর রহমান উচ্চ শিক্ষিত-কর্মজীবনে প্রতিষ্টিত। এম. সাইফুর রহমানের একমাত্র কন্যা সাইফা রহমান চট্টগ্রামের আরেক অভিজাত পরিবারে-ভালোঘরে-ভালোবরে পাত্রস্থ। জনাব এম. সাইফুর রহমানের মত উচুদরের-বড় মাপের মানুষের যথার্থ মূল্যায়ন ও স্মৃতি কথা লেখা খুবই কঠিন ও জটিল কাজ। তার দলের একজন কর্মি হিসাবে তাকে কাছে থেকে দেখেছি-জেনেছি-এ আমার সামান্য কর্ম জীবনের গৌরবজনক কাজ। তিনি আমাদের প্রজন্মের কাছে ভাই মার্কা শুধু নেতা ছিলেন না,-তিনি ছিলেন একজন রাজনৈতিক শিক্ষক-পিতৃতুল্য অভিভাবক। আমি বাল্য-কৈশোরে পিতৃহাজার হয়ে এতিম। পিতার ¯েœহমমতা ছায়ামায়া খুব কম পেয়েছি। পিতার হাত ধরে ঈদে-চান্দে-মেলায় খেলায়-মাজারে-বাজারে আমার জীবনেই যাওয়া হয়নি। তাঁর সহকর্মি নয়, একজন কর্মি হিসাবে তার অনুগামী হিসাবে সিলেটে-ঢাকায়-তাঁর পিছু পিছু ছুটেছি-হৃদয় দিয়ে পিতৃ¯েœহ-অনুভব করেছি। তিনি আমাকে পুত্রবৎ ¯েœহ করতেন। আমি তাঁকে নেতা নয়-পিতার মত ভক্তি শ্রদ্ধা করতাম-করিও। ঢাকায় মিনিষ্টিতে-অফিস ও ব্যাংক আঙ্গিনায় আমাকে আলাদা একটা সম্মান দেয়া হত। আমার নাম, উচ্চতা ও দেহ সৌষ্টাব তার সঙ্গে সাদৃশ্য থাকায় অনেকে আমাকে-স্যারের-ছোট ভাই বলে সম্মোধন করতেন। আমি বিনয়ের সঙ্গে বলতাম স্যার-এর ভাই নইসহকর্মি নই-আমি তার একজন স্বেহধন্য কর্মি মাত্র। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য দুই হাজার এক সালে জোট সরকারামলে একজন সিনিওর আইনজীবী হিসাবে পি.পি. জি.পি. শীপে না যাওয়াতে তিনি তার পসন্দ মত আমাকে একটি রাষ্ট্রয়াত্ত বানিজ্যিক ব্যাংক এর পরিচালক বানিয়ে ছিলেন। দু’বছর পর আমি নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান হয়েছিলাম। মাসিক মাত্র চার হাজার টাকা ভাতা এবং হাজার কয়েক টাকা টি,এ, নিয়েছি। বোর্ড মিটিং-এ-নাগেলে পাঁচ টাকা পাওয়ার ও কোন সুযোগ ছিল না। জোট সরকারের পূর্ণ পাঁচ বছর মেয়াদে একদিন ও ব্যাংক এর টাকায় তারকা হোটেলে থাকিনি, কয়েক শটাকার আমার স্বদেশী হোটেল আলফারুকই ছিল ভরসা। ব্যাংক এর পাঁচ বছর আমি খুব বহুমুখী চাপে ছিলাম। দেশীয় বহু শিল্পপতি ব্যাংক-বীমা-লিজিং কোম্পানী করতে চেয়েছেন, আমাকে মাগনা ডিরেক্টরশীপ এর বিনিময়ে লাইসেন্স পেতে তার ও মন্ত্রনালয় এর সঙ্গে লাইন লাগিয়ে দিতে বলেছেন-আমি বরাবরই এড়িয়ে গেছি, ব্যবসায়ী নই, ব্যবসা বানিজ্য বুঝি না বলে বরাবরই এড়িয়ে গেছি। অর্থমন্ত্রী এম. সাইফুর রহমানের শেখানো মতে-দেখানো পথে পূর্ণ পাঁচ বছর-“চেক হুন্ডি-ইউজ ব্যাংকিং চ্যেনেল-শ্লোগানের সমর্থনে ব্যাংকের সভা সমাবেশ, এনুয়্যেল কনফারেন্স, অর্থনৈতিক সেমিনারে ভাষন দিয়েছি, পত্র পত্রিকায় কলাম লিখেছি। নামে বেনামে ব্যাংক ঋন কিংবা কোন কমিশন নেইনি, সততা ও নিরপেক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছি। নব্বইর দশকে এম. সাইফুর রহমান আমাকে তার ও আমার জেলার পাবলিক প্রসিকিউটার বানিয়েছিলেন, তিনি যখনই আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছেন সে দায়িত্ব আমি সততা ও বিম্বস্থতার সাথে পালন করেছি। তার কাছের লোক বলে আমি ব্যাংকিং সেক্টারে দাপট দেখাইনি, ক্ষমতার অপব্যবহারও করিনি। এই আমলে একজন মফস্বলি শ’কয়েক টাকা বেতনের প্রাইমারী টিচার জান্নাত আরা হেনরী সোনালি ব্যাংক এর পরিচালক হয়ে ক্ষতার অপব্যবহার করতঃ কোটি কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক হয়েছেন, দুদকের নোটিশ এবং মিডিয়ার কল্যানে দেশও জাতি তা অবহিত হয়েছেন। রবীন্দ্রনুরাগি মিঃ সুভাষ সিংহ রায় টিভিতে সিংহের মত গর্জন করলেও সোনালি ব্যাংক এর স্বার্থ রক্ষা এবঙ হলমার্কীয় লুন্টনের বিরুদ্ধে বিড়ালের মত মিউ মিউ ও কেরন নি। জাতীয়তাবাদী সকল সরকারামলে মন্ত্রী এম. সাইফুর রহমানের বলিষ্ট ও গতিশীল নেতৃত্বে অর্থনৈতিক সেক্টারে শৃংখলা ছিল। লুন্টন ছিল না।
গোলবাটামুখ, উন্নতি নাসিকা, ভাষা ভাষা উজ্জল স্বপ্নময় দুই চোখ, ব্যাক ব্রাশ করা চুল, ক্লিন শেভে পরিচ্ছন্ন পোষাকী প্রায় ছয়ফুট উচ্চতার মায়াবী শ্যাম বর্ণের এম. সাইফুর রহমান একজন আকর্ষনীয় ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন ধর্মপ্রান-সাচ্চা জাতীয়তাবাদী, দেশ প্রেমিক, সহজ সরল সাদা মনের মানুষ। এই সাত বছরেও তিনি আছেন আমাদের অন্তরে। অনুভবে। কবিও গবেষক লেঃ কর্নেল (অবঃ) সৈয়দ আলী আহমদ তার পরিশ্রমী কারিগরঃ এম সাইফুর রহমান”-কবিতায় যথার্থই বলেন-
-এই দেশ একদিন ঘুরে দাড়াবে-এই প্রত্যয়ে
নির্ভিক চিত্ত, বলিষ্ট কন্ট, তাঁর শক্ত ঈমান-
আমাদের সকলের প্রিয় সাইফুর রহমান।
বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী সফল অর্থমন্ত্রী, আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন অর্থনীতিবিদ ভাষা সৈনিক এম. সাইফুর রহমানের সপ্তম মৃত্যোবার্ষিকীতে তাঁর উজ্জল স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি, তার র”হের মাগফিরাত কামনা করছি। মহান মালিক তাঁর বেহেশত নসীব কর”ন-এই মোনাজাত সহ আমীন। ছুম্মা আমীন।
(লেখক: একটি রাষ্ট্রায়াত্ব বানিজ্যিক ব্যাংক এর সাবেক পরিচালক ও চেয়ারম্যান নির্বাহী কমিটি। সিনিওর এডভোকেট, হাইকোর্ট। সাবেক সভাপতি, মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব। মুক্তিযোদ্ধা। কলামিষ্ট)

No comments: