সাকিবের ‘বেঁচে যাওয়া’ এবং সংবাদ বিক্রির প্রতিযোগিতা

আমীন আল রশীদ: অস্বীকার করার উপায় নেই, সংবাদও পণ্য। অতএব এই পণ্যকে কে কত আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে, তার উপরে নির্ভর করে এর দাম। ফলে সংবাদকে বিকৃত করা, উদ্ভট শিরোনাম দিয়ে পাঠকের নজর কাড়া এবং ব্রেকিংয়ের নামে মিথ্যা ও ভুল খবর পরিবেশনের প্রবণতা বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। বিশেষ করে একশ্রেণির ভুঁইফোড় অনলাইন সংবাদপত্রের দৌরাত্ম্যে।
ক্রিকেটের অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান সংবাদমাধ্যমের জন্য অবশ্যই একটি বিক্রয়যোগ্য পণ্য। সাকিব যদি সেঞ্চুরি মারেন সেটি যেমন সংবাদ, তেমনি তিনি কোরবানিতে কোন রঙের গরু কিনলেন, সেটিও সংবাদ। সুতরাং তাকে নামিয়ে দেয়ার পরেই যদি সেই হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হয়, সেটিরও নিশ্চয়ই সংবাদমূল্য রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আপনি কীভাবে এই সংবাদটি বা পণ্যটি বিক্রি করবেন।
যদি আপনি সৎ ব্যবসায়ী হন, তাহলে বাড়তি রঙচঙ ছাড়াই, পণ্যটি যা সেভাবেই পরিবেশন করবেন। আলগা রঙ মেখে ছাগলকে হরিণ বানানোর চেষ্টা করবেন না। কিন্তু আমাদের গণমাধ্যম অন্যের চেয়ে এগিয়ে থাকার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নামতে গিয়ে প্রতিনিয়তই ছাগলের গায়ে হলুদ (হলুদ সাংবাদিকতা অর্থে) রঙ মেখে হরিণ বানানোর চেষ্টা করে। সাকিব আল হাসানও সেই প্রচেষ্টা থেকে বাদ পড়বেন না, এটিই স্বাভাবিক।
ঘটনা ১৬ সেপ্টেম্বরের। কক্সবাজারের উখিয়ায় সমুদ্রসৈকতে পর্যটকবাহী একটি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়। এতে এর এক আরোহী নিহত হন। আহত হন আরো চারজন। দুর্ঘটনার কিছুক্ষণ আগে উখিয়ার একটি হোটেলে সাকিবকে নামিয়ে দিয়ে ফিরছিল হেলিকপ্টারটি। আর এরপরই সংবাদমাধ্যমের কমন শিরোনাম: ‘অল্পের জন্য বেঁচে গেলেন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান।’
কক্সবাজার বিমানবন্দরের ম্যানেজার সাধন কুমার মহন্ত গণমাধ্যমকে বলেছেন, পর্যটকবাহী মেঘনা এভিয়েশনের হেলিকপ্টারটি ঢাকা থেকে ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকে নিয়ে কক্সবাজারের উখিয়ার হোটেল রয়েল টিউলিপে গিয়েছিল। হোটেলে সাকিব আল হাসানকে নামিয়ে দিয়ে ফেরার পথে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে রেজু খাল এলাকায় সমুদ্র সৈকতে বিধ্বস্ত হয়।
বিভিন্ন অনলাইন সংবাদপত্র তো বটেই, প্রথম আলোর মতো জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা পত্রিকাগুলোর শিরোনামও ছিল ‘অল্পের জন্য বেঁচে গেলেন সাকিব’। অর্থাৎ সবাই সাকিব আল হাসান নামটিকে বিক্রি করার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নামেন। কথা হলো, সাকিব কী করে অল্পের জন্য বেঁচে গেলেন? তিনি তো হেলিকপ্টারে ছিলেন না। আবার তিনি হেলিকপ্টারে থাকা অবস্থায় তাতে যান্ত্রিক ত্রুটি ধরা পড়েছে, এমনও নয়। বরং তাকে যখন নামিয়ে দেয়া হয় তখনও হেলিকপ্টারটি ত্রুটিমুক্ত। বরং কোনো কোনো গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, দরজা খুলে সেলফি তুলতে ও ভিডিও করতে গিয়েই দুর্ঘটনার কবলে হেলিকপ্টারটি।
কক্সবাজারের উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল খায়েরের বরাত দিয়ে ওই খবরে বলা হয়েছে, হেলিকপ্টার সাকিব আল হাসানকে ইনানিতে নামিয়ে দিয়েই ফেরার পথে পাইলটের কথা অমান্য করে নিহত শাহ আলমসহ অন্যরা হেলিকপ্টারের দরজা খুলে ছবি তুলছিল ও ভিডিও করছিল। এসময় বাতাসের তারতম্যে ভারসাম্য হারিয়ে বিধ্বস্ত হয় হেলিকপ্টারটি।
এই যদি হয় ঘটনা, তাহলে ‘সাকিব অল্পের জন্য বেঁচে গেছেন’ এই কথা আমরা কী করে বলি এবং কী করে এরকম একটি অসম্পূর্ণ এবং বিভ্রান্তিকর বাক্য মূলধারার গণমাধ্যমেরও শিরোনাম হয়?
সাকিব যদি হেলিকপ্টারে থাকতেন এবং সেই অবস্থায় এটি বিধ্বস্ত হওয়ার পরও তিনি সুস্থ থাকতেন, তাহলেই কেবল এই শিরোনাম হতে পারত। যেখানে সাকিব উপস্থিতই ছিলেন না, সেখানে তার বেঁচে থাকা মরে যাওয়ার তো প্রশ্ন ওঠে না। আবার যদি এমন হত যে, হেলিকপ্টারে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়ায় জরুরীভিত্তিতে সাকিবকে নামিয়ে দেয়া হয়েছে এবং তারপরই এটি বিধ্বস্ত হয়েছে, তাহলেও এরকম শিরোনাম করা যেত যে, ‘অল্পের জন্য বেঁচে গেলেন সাকিব’। কিন্তু এর কিছুই হয়নি। সাকিবকে যখন নামানো হয়েছে তখন পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক এবং এরপরেই যাত্রীদের অবহেলায় হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হয়েছে। এখানে সাকিবকে টেনে এনে সংবাদকে বিক্রির উপযোগী করতে হলুদ রঙ মাখা বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার মধ্যে পড়ে না।
বরং সাকিবকে নামিয়ে দেয়ার পরই হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হয়...সংবাদ হিসেবে এই বাক্যটিই যথেষ্ট। এখানে সাকিবের বেঁচে যাওয়া মরে যাওয়ার প্রসঙ্গটি অবান্তর। কেননা কী হইলে কী হইত বা কী করিলে কী হইতো টাইপের জিনিস দিয়ে সাংবাদিকতা হয় না। সাকিব যদি মাগুরায় জন্ম না নিয়ে ঝালকাঠিতে জন্ম নিতেন, তাহলে তিনি ক্রিকেটার না হয়ে হয়তো সাংবাদিক হতেন। তাহলে কি এখন আমরা এরকম একটি খবরের শিরোনাম দেব যে, অল্পের জন্য সাংবাদিক হতে পারলেন না সাকিব আল হাসান?
হতে পারত নাও হতে পারত....এসব সাংবাকিতার ভাষা নয়। যা হয়েছে সেটি হচ্ছে সংবাদ। তবে প্রেডিকশন বা ধারণাও কখনো সখনো সংবাদ হতে পারে। যেমন ‘বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে’- আবহাওয়া অফিস যদি এই তথ্য দেয়, তাহলে এই ধারণা বা আশঙ্কাটি এ কারণে খবর যে, উপকূলের মানুষকে সাবধানে থাকতে বলা হবে। সমুদ্রের বেশি দূরে মাছ ধরার ট্রলার নৌকা যাতে না যায়, সেই পরামর্শ দেয়া হবে। কিন্তু সাকিব হেলিকপ্টারে থাকলে দুর্ঘটনায় পতিত হতেন, তিনি আহত হতেন কী নিহত হতেন অথবা অক্ষত থাকতেন, এটির কোনো প্রেডিকশন হয় না।

আরও বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার পরদিন একটি প্রথম সারির জাতীয় দৈনিকের খবরে লেখা হয়ছে, ‘অল্পের জন্য বেঁচে গেলেন ক্রিকেটের বরপুত্র সাকিব আল হাসান।’ ক্যারিবিয়ান গ্রেট ব্রায়ান লারাকে বলা হয় ক্রিকেটের বরপুত্র। এবং এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত উপাধি। শচিনকে যেমন বলা হয় লিটল মাস্টার। একইভাবে আমাদের মোস্তাফিজকেও বলা হচ্ছে কাটার মাস্টার। এগুলো সবই স্বীকৃত। কিন্তু সাকিব কবে ক্রিকেটের বরপুত্র হলেন তা অন্তত আমার জানা নেই। আর যে উপাধি ইতিমধ্যে ব্রায়ান লারার মতো কিংবদন্তিকে দেয়া হয়েছে, সেই একই উপাধি কী করে সাকিব আল হাসানকে দেয়া হবে?
সাকিব অবশ্যই এরকম কোনো উপাধি পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, লারার উপাধিটিই তাকে দিতে হবে। আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চয়ই তাকে অন্য কোনো উপাধি দেয়া যেতেই পারে। সুতরাং যেভাবে তাকে ক্রিকেটের বরপুত্র উপাধি দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে, সেটি খুব ভদ্র ভাষায় বললে, অতিরঞ্জন। আর বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতাকে নষ্ট করে যেসব উপাদান, অতিরঞ্জন তার অন্যতম।

No comments: